জমির দলিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি। এটা জমির মালিকানা প্রমাণের মূল দলিল, যা ছাড়া জমি কেনা-বেচা, নামজারি, লোন নেওয়া, আদালতে মামলা করা—সবকিছুতেই জটিলতা তৈরি হয়। তাই দলিল হারিয়ে যাওয়া, চুরি হয়ে যাওয়া বা আগুনে পুড়ে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঘটনা মালিকের জন্য বড় আতঙ্কের কারণ।
কিন্তু চিন্তার কিছু নেই। বাংলাদেশে আইন অনুযায়ী দলিল হারালেও বা পুড়ে গেলেও মালিক তার মালিকানা হারান না। সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে আপনি আবার দলিলের সত্যায়িত কপি (জাবেদা নকল) সংগ্রহ করতে পারবেন এবং প্রয়োজনীয় আইনি কাজ স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে নিতে পারবেন।
দলিল হারানো বা পুড়ে যাওয়ার পর প্রথম করণীয়
দলিল হারালে অনেকে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেরি করে দেন। অথচ যত দ্রুত আপনি প্রক্রিয়া শুরু করবেন, তত কম ঝামেলা হবে।
দলিল হারানোর পর ৪টি ধাপ জরুরি—
ধাপ–১: কাছের থানায় সাধারণ ডায়রি (GD) করুন
দলিল হারালে, চুরি হলে বা আগুনে নষ্ট হলে অবশ্যই প্রথমে GD করতে হবে।
GD-তে যে বিষয়গুলো উল্লেখ করবেন—
- দলিল হারানোর সময়, স্থান
- দলিলের প্রকৃতি (কবলা, হেবাক, বিনিময়, দান, সাবকবলা ইত্যাদি)
- দলিল নম্বর (যদি জানা থাকে)
- দাতা–গ্রহীতার নাম
- মৌজা, খতিয়ান, দাগ, রেজিস্ট্রি অফিসের নাম
- পুড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আগুন লাগার কারণ
GD কপি পরবর্তী সব কর্মকাণ্ডে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
ধাপ–২: স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ
GD করার পর স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় ‘হারানো দলিল সম্পর্কিত ঘোষণা’ দিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা উত্তম।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করবেন—
- দলিলের বর্ণনা
- হারানোর তারিখ
- মালিক হিসেবে দাবি
- সম্ভাব্য কোনো অসৎ ব্যবহার হলে দায় নেবেন না
- পাওয়ার অনুরোধ
এই বিজ্ঞপ্তি আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করে এবং পরবর্তী যে কোনো জটিলতা এড়াতে সাহায্য করে।
ধাপ–৩: রেজিস্ট্রি অফিসে নকলের আবেদন
এরপর আপনাকে যেতে হবে সেই সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে, যেখানে দলিলটি মূলত নিবন্ধিত হয়েছিল।
সেখানে জাবেদা নকল বা সার্টিফায়েড কপি নেওয়ার আবেদন করতে হবে।
এই আবেদন আইনগতভাবে বৈধ দলিল হিসেবে স্বীকৃত এবং মালিকানার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারযোগ্য।
ধাপ–৪: অতিরিক্ত প্রমাণ সংগ্রহ করুন
দলিল হারানো বা পুড়ে যাওয়ার ঘটনা প্রমাণে নিচের ডকুমেন্টগুলো সহায়ক—
- GD কপি
- পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির কপি
- পুরনো ফটোকপি (যদি থাকে)
- নামজারি খতিয়ান / দাখিলা
- ট্যাক্স রসিদ
- ভূমি অফিসের রেকর্ড
যত বেশি প্রমাণ থাকবে, তত দ্রুত নকল পাওয়া সহজ হবে।
জমির দলিল হারালে কীভাবে জাবেদা নকল তুলবেন?
এখন নিচে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে তুলে ধরা হলো—
১. আবেদন ফরম সংগ্রহ
জাবেদা নকল তোলার জন্য ফরম ৩৬ / ৩৭ ব্যবহার করা হয়।
এটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে পাওয়া যায়।
ফরমে দিতে হবে—
- দলিল নম্বর
- সাল
- দাতা–গ্রহীতার নাম
- মৌজা, খতিয়ান, দাগ
- জমির পরিমাণ
- আবেদনকারীর নাম, ঠিকানা, মোবাইল
২. কোর্ট ফি ও সরকারি ফি সংযুক্ত
আবেদনের সাথে ২০ টাকার কোর্ট ফি যুক্ত করতে হয়।
এছাড়া বিভিন্ন শব্দসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে:
- জি(এ) ফি
- জিজি ফি
- স্ট্যাম্প ফি
- তল্লাশ ফি
- পরিদর্শন ফি গ্রহণ করা হয়।
৩. দলিল তল্লাশ (যদি দলিল নম্বর জানা না থাকে)
দলিলের নম্বর না থাকলে বা কপি না থাকলে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে সূচিবহি (Index Book) থেকে দলিল তল্লাশ করতে হয়।
এক্ষেত্রে ফি—
- এফ(১): ২০ টাকা
- এফ(২): ১০ টাকা
রেজিস্ট্রি অফিস কর্মচারীরা আপনার দেওয়া দাতা বা গ্রহীতা নামের ভিত্তিতে রেকর্ড বের করে দেবেন।
৪. নকল প্রস্তুতকরণ
দলিল খুঁজে পাওয়ার পর—
- নকল টাইপ/লিখন
- মূল দলিলের সাথে মিলিয়ে দেখা
- সহকারী কমিশনার (ভূমি) / সাব-রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
নকল সম্পূর্ণভাবে মূল দলিলের হুবহু অনুলিপি।
৫. নকল সংগ্রহ
আবেদন অনুযায়ী:
- সাধারণ কপি – ৩ থেকে ৫ দিনের মধ্যে
- অগ্রাধিকার কপি – ১ দিনের মধ্যেও পাওয়া যায়।
দলিল হারালে বা পুড়ে গেলে নকল তোলার খরচ কত?
সাধারণত খরচ নির্ভর করে—
- দলিলের দৈর্ঘ্য
- শব্দ সংখ্যা
- পাতার সংখ্যা
- অগ্রাধিকার সেবা নিলে
- তল্লাশ লাগলে
তবে সাধারণভাবে নিচের ফিগুলো যুক্ত হয়—
| ফি | পরিমাণ |
| স্ট্যাম্প শুল্ক | ১০০–২০০ টাকা |
| জি(এ) ফি | প্রতি ৩০০ শব্দে ১৬–২৪ টাকা |
| জিজি ফি | প্রতি ৩০০ শব্দে ৩৬ টাকা |
| কোর্ট ফি | ২০ টাকা |
| তল্লাশ ফি (F-1) | ২০ টাকা |
| পরিদর্শন ফি (F-2) | ১০ টাকা |
| অগ্রাধিকার ফি | ৫০ টাকা + প্রতি অতিরিক্ত পৃষ্ঠা ১৫ টাকা |
সাধারণত মোট খরচ ৪০০ থেকে ৯০০ টাকার মধ্যে হয়। দলিল বড় হলে তা ১০০০ টাকার উপরে যেতে পারে।
দলিল হারানোর পর কি মালিকানা নষ্ট হয়?
না, কখনোই না। বাংলাদেশের নিবন্ধন আইন অনুযায়ী, দলিল হারিয়ে গেলেও মালিকানা অটুট থাকে। মালিকানা নির্ভর করে—
- রেজিস্ট্রি অফিসে রক্ষিত মূল দলিল
- নামজারি রেকর্ড
- ভূমি কর রশিদ
- অন্যান্য মালিকানা প্রমাণাদি
এই কারণেই নকল দলিল (জাবেদা কপি) নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দলিল হারালে কি মামলা হবে?
দলিল হারানো স্বাভাবিক ঘটনা, তাই সাধারণত কোনো মামলা হয় না।
তবে—
- GD করা
- বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ
- নকল সংগ্রহ অবশ্যই করতে হবে।
কিন্তু দলিল চুরি হয়ে গেলে বা জমি নিয়ে বিবাদ থাকলে প্রতিপক্ষ আইনি সুবিধা নিতে পারে। তাই দ্রুত জিডি ও নকল তোলা জরুরি।
দলিল হারানোর পর কোন কোন ঝুঁকি থাকে?
দলিল ভুল হাতে গেলে নিম্নোক্ত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—
- দলিল জালিয়াতি
- মিথ্যা বিক্রির চেষ্টা
- জমি দখলের চেষ্টা
- আদালতে মিথ্যা দাবি
এ কারণে সময়মতো জিডি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। GD থাকার কারণে আপনার বিরুদ্ধে কেউ দলিল ব্যবহার করতে পারবে না।
দলিল হারালে বা পুড়ে গেলে যেসব কাগজপত্র প্রয়োজন
নিচের ডকুমেন্টগুলো রাখলে প্রক্রিয়া দ্রুত হয়—
- থানায় করা GD কপি
- পত্রিকার বিজ্ঞপ্তি
- ভূমি কর রশিদ
- নামজারি খতিয়ান
- দাখিলা
- পুরনো দলিলের ফটোকপি (যদি থেকে থাকে)
- জাতীয় পরিচয়পত্র
- আবেদন ফরম (৩৬/৩৭)
- রেজিস্ট্রি অফিসের রিসিভ কপি
দলিল হারানোর পর কি অনলাইনে যাচাই করা যায়?
হ্যাঁ, এখন কিছু তথ্য অনলাইনে পাওয়া যায় যেমন—
- দলিল নিবন্ধন সনদ (e-Deed)
- খতিয়ান (e-Khatian)
- ভূমি উন্নয়ন কর
- রেকর্ড রুম ইনডেক্স
তবে জাবেদা নকল পুরোপুরি অনলাইনে পাওয়া যায় না। অবশ্যই রেজিস্ট্রি অফিসে যেতে হয়।
দলিল হারানোর পর যে ভুলগুলো করবেন না
অনেকে ভুল করেন, যার কারণে ঝামেলা বাড়ে—
১. দেরি করা
জিডি করতে দেরি করলে আইনি ঝুঁকি তৈরি হয়।
২. ভুল বা অস্পষ্ট তথ্য দিয়ে GD করা
দলিল নম্বর/সাল/নাম ভুল লিখলে পরে সমস্যা হয়।
৩. পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি না দেওয়া
এটি আইনি সুরক্ষা কমিয়ে দেয়।
৪. ব্রোকার/দালালের মাধ্যমে কাজ করা
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয় বা ভুল তথ্য দেওয়া হয়।
৫. নকল পাওয়ার পর ভুল না দেখে সই করা
প্রতিটি পৃষ্ঠা দেখে নিন:
- নাম
- বালাম বই
- খতিয়ান
- দাগ
- জমির পরিমাণ
- তারিখ
যদি ভুল থাকে সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করিয়ে নিন।
দলিল হারালে কি নামজারি বন্ধ হয়ে যায়?
না। কিন্তু নতুন নকল জমা দিতে হবে। নামজারি অফিস (AC Land) সকলে নকল দলিল গ্রহণ করে।
জমির দলিল হারালে বা পুড়ে গেলে করণীয় — সারসংক্ষেপ
নিচে সহজভাবে পুরো প্রক্রিয়া তুলে ধরা হলো—
- থানায় GD করুন
- পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিন
- সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে নকলের আবেদন করুন
- তল্লাশ লাগলে F-1, F-2 ফি দিয়ে রেকর্ড বের করুন
- নকল প্রস্তুত হলে সংগ্রহ করুন
- নকল, GD কপি, বিজ্ঞপ্তি—এসব একসাথে সংরক্ষণ করুন
- নামজারি, লোন, বিক্রি—সব কার্যক্রম আবার স্বাভাবিকভাবে করতে পারবেন
দলিল হারানো বা পুড়ে যাওয়া নিয়ে সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)
১. দলিল হারালে কি জমির মালিকানা হারিয়ে যায়?
না, মালিকানা নষ্ট হয় না। রেজিস্ট্রি অফিসে মূল রেকর্ড থাকে।
২. GD ছাড়া কি নকল পাওয়া যায়?
হ্যাঁ, পাওয়া যায়, তবে চুরি বা হারানোর ক্ষেত্রে GD করা ভালো।
৩. পুড়ে গেলে দলিলের কিছু অংশ থাকলে কি তা কাজে লাগে?
হ্যাঁ। তা প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
৪. নকল তুলতে কত দিন লাগে?
সাধারণত ৩–৫ দিন, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ১ দিন।
৫. নকল কি আদালতে বৈধ?
হ্যাঁ, সম্পূর্ণ বৈধ।
৬. দলিলের নকল কতবার তোলা যায়?
যতবার প্রয়োজন—সীমা নেই।
৭. নকল কি অনলাইনে পাওয়া যায়?
এখনো না।
৮. দলিল নম্বর না জানলে কী করবেন?
সূচিবহি থেকে তল্লাশ করলেই পাওয়া যায়।
উপসংহার
জমির দলিল হারানো বা পুড়ে যাওয়া আতঙ্কজনক হলেও আইনগতভাবে সমস্যা সমাধান খুবই সহজ। বাংলাদেশে রেজিস্ট্রি অফিসে প্রতিটি দলিলের কপি নিরাপদে সংরক্ষিত থাকে। তাই প্রয়োজনীয় নিয়ম মেনে চললে আপনি সহজেই জাবেদা নকল সংগ্রহ করতে পারবেন এবং জমির মালিকানা সম্পর্কিত সব আইনি কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে করতে পারবেন।
GD, বিজ্ঞপ্তি, তল্লাশ, নকল সংগ্রহ—এই চার ধাপ ঠিকভাবে অনুসরণ করলে কোনো জটিলতা থাকবে না।



