দাম্পত্য জীবন সবসময় প্রত্যাশামতো এগোয় না। পারিবারিক কলহ, মানসিক দূরত্ব, নির্যাতন বা মৌলিক মতপার্থক্যের কারণে অনেক সময় সংসার টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। এমন পরিস্থিতিতে আইনি প্রক্রিয়া না জেনে এগোলে ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এই আর্টিকেলে বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী ডিভোর্সের সম্পূর্ণ নিয়ম, প্রকারভেদ, আইনি প্রক্রিয়া এবং ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক পরিবর্তনসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য তৈরি, নির্দিষ্ট আইনি সমস্যায় অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১: মূল ভিত্তি
বাংলাদেশে মুসলিমদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ পরিচালিত হয় মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ (Muslim Family Laws Ordinance, 1961) অনুযায়ী। এই অধ্যাদেশ তালাক প্রদানের পদ্ধতি, নোটিশ পাঠানোর নিয়ম, সালিশি পরিষদের ভূমিকা এবং তালাক কার্যকর হওয়ার শর্ত নির্ধারণ করে দিয়েছে। এর সাথে সম্পর্কিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আইন হলো মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন, ১৯৭৪, যা বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনের নিয়ম নির্ধারণ করে।
এই দুটি আইন একসাথে পড়লে বোঝা যায়—
- তালাক শুধু মৌখিকভাবে বলে দিলেই আইনিভাবে কার্যকর হয় না।
- নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ না করলে তালাক বৈধ হলেও নিবন্ধনজনিত জটিলতা তৈরি হতে পারে এবং ফৌজদারি দায়ও বর্তাতে পারে।
- তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট অপেক্ষমাণ সময় (ইদ্দতকাল) পার হতে হয়।
চলুন এবার দেখি, কে কীভাবে তালাক দিতে পারেন।

ডিভোর্সের প্রকারভেদ
বাংলাদেশে মুসলিম আইন অনুযায়ী তালাক মূলত তিন ধরনের হতে পারে।
১. স্বামীর পক্ষ থেকে তালাক
স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার অধিকার সরাসরি রাখেন। এক্ষেত্রে স্বামীকে মৌখিক বা লিখিতভাবে তালাক উচ্চারণ করতে হয় এবং এরপর নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা সিটি কর্পোরেশন/পৌরসভার মেয়রের কাছে লিখিত নোটিশ পাঠাতে হয়। স্ত্রীকেও নোটিশের একটি কপি পাঠানো বাধ্যতামূলক।
২. স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাক (তালাক-ই-তাফবিজ)
সাধারণভাবে ধারণা করা হয় শুধু স্বামীই তালাক দিতে পারেন, কিন্তু বাস্তবে তা নয়। কাবিননামায় (বিবাহ নিবন্ধন দলিল) যদি স্বামী স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করে থাকেন—যাকে বলা হয় তালাক-ই-তাফবিজ—তাহলে স্ত্রীও নিজে তালাক প্রদান করতে পারেন। কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে এই ক্ষমতা অর্পণের বিষয়টি উল্লেখ থাকে। এক্ষেত্রে প্রক্রিয়া মূলত স্বামীর তালাকের মতোই—নোটিশ পাঠানো, ইদ্দতকাল পার হওয়া এবং নিবন্ধন করা।
এছাড়া স্ত্রী চাইলে পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করেও বিবাহবিচ্ছেদের জন্য আবেদন করতে পারেন, বিশেষত যখন স্বামী তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করেননি বা নির্যাতন, ভরণপোষণে ব্যর্থতা কিংবা অন্য কোনো ন্যায্য কারণ থাকে।
৩. পারস্পরিক সম্মতিতে ডিভোর্স বা খুলা তালাক
দুই পক্ষ যখন একসাথে সিদ্ধান্ত নেন যে সংসার আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়, তখন তা খুলা তালাক নামে পরিচিত। এক্ষেত্রে সাধারণত স্ত্রী স্বামীকে কিছু আর্থিক সুবিধা (যেমন দেনমোহর মওকুফ) দেওয়ার বিনিময়ে তালাক গ্রহণ করেন এবং স্বামী তা মেনে নেন। প্রক্রিয়াগতভাবে এটিও একই নোটিশ ও নিবন্ধন পদ্ধতি অনুসরণ করে, তবে যেহেতু উভয় পক্ষ সম্মত থাকেন, তাই সালিশি পরিষদে সমঝোতার সম্ভাবনা কম থাকে এবং প্রক্রিয়া তুলনামূলক দ্রুত সম্পন্ন হয়।
আইনি প্রক্রিয়া: ধাপে ধাপে
তালাক যে পক্ষ থেকেই আসুক না কেন, আইনি প্রক্রিয়া মোটামুটি একই ধরনের ধাপ অনুসরণ করে।
ধাপ ১: লিখিত নোটিশ প্রস্তুত ও জমা দেওয়া
তালাক উচ্চারণের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে (স্বামী, স্ত্রী বা তালাক-ই-তাফবিজপ্রাপ্ত স্ত্রী) একটি লিখিত নোটিশ তৈরি করতে হয়, যেখানে তালাকের ঘোষণা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। এই নোটিশ পাঠাতে হবে—
- যেখানে দম্পতি বসবাস করেন সেই এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান (গ্রামাঞ্চলে) অথবা সিটি কর্পোরেশন/পৌরসভার মেয়র (শহরাঞ্চলে) বরাবর, এবং
- অপর পক্ষকে (স্ত্রী বা স্বামীকে) একটি কপি।
নোটিশ ডাকযোগে রেজিস্ট্রি বা কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠানো নিরাপদ, যাতে প্রাপ্তির প্রমাণ থাকে।
ধাপ ২: সালিশি পরিষদ গঠন
নোটিশ পাওয়ার পর চেয়ারম্যান বা মেয়র একটি সালিশি পরিষদ (Arbitration Council) গঠন করেন। এই পরিষদের দায়িত্ব হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করা এবং সম্ভব হলে তালাক প্রতিরোধ করা। উভয় পক্ষ থেকে একজন করে প্রতিনিধি নিয়ে এই পরিষদ গঠিত হয়, এবং চেয়ারম্যান/মেয়র এর সভাপতিত্ব করেন।
ধাপ ৩: ৯০ দিনের ইদ্দতকাল
আইন অনুযায়ী, নোটিশ পাওয়ার তারিখ থেকে ৯০ দিন সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে, যাকে বলা হয় ইদ্দতকাল। এই সময়ের মধ্যে—
- সালিশি পরিষদ সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে যায়,
- যদি স্ত্রী গর্ভবতী থাকেন, তাহলে সন্তান জন্মদান পর্যন্ত ইদ্দতকাল বর্ধিত হতে পারে,
- এই সময়ের মধ্যে দম্পতি যদি পুনরায় একত্রে বসবাস শুরু করেন (দাম্পত্য সম্পর্ক পুনঃস্থাপন), তাহলে তালাক বাতিল বলে গণ্য হয়।
৯০ দিন পার হয়ে গেলে এবং কোনো সমঝোতা না হলে তালাক আইনগতভাবে কার্যকর হয়ে যায়—এমনকি সালিশি পরিষদের বৈঠক না হলেও। এটি অনেকেই ভুল বোঝেন—মনে করেন সালিশি পরিষদের অনুমোদন ছাড়া তালাক কার্যকর হয় না, বাস্তবে তা নয়। নির্দিষ্ট সময় পার হলেই তালাক কার্যকর ধরা হয়।
ডিভোর্স কার্যকর হওয়ার পর করণীয়
তালাক কার্যকর হয়ে যাওয়ার পরেই কাজ শেষ হয়ে যায় না। এরপর দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন করতে হয়।
১. চেয়ারম্যান/মেয়রের সার্টিফিকেট সংগ্রহ
৯০ দিন পার হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা সিটি কর্পোরেশন/পৌরসভার মেয়র একটি তালাক কার্যকরের সার্টিফিকেট প্রদান করেন। এই সার্টিফিকেট প্রমাণ করে যে আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়েছে এবং তালাক কার্যকর হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে পুনর্বিবাহ, সম্পত্তি বণ্টন বা যেকোনো আইনি প্রয়োজনে এই সার্টিফিকেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
২. নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছে তালাক নিবন্ধন
তালাকের সার্টিফিকেট পাওয়ার পর যেই কাজী বা নিকাহ রেজিস্ট্রার মূল বিবাহ নিবন্ধন করেছিলেন, তার কাছে গিয়ে তালাক নিবন্ধন করাতে হয়। এই নিবন্ধনের মাধ্যমে সরকারি রেকর্ডে বিবাহবিচ্ছেদ আনুষ্ঠানিকভাবে লিপিবদ্ধ হয়। নিবন্ধনের সময় প্রয়োজন হয়—
- মূল কাবিননামার কপি,
- চেয়ারম্যান/মেয়রের প্রদত্ত তালাক কার্যকরের সার্টিফিকেট,
- উভয় পক্ষের জাতীয় পরিচয়পত্র,
- নির্ধারিত নিবন্ধন ফি।
নিবন্ধন সম্পন্ন হলে নিকাহ রেজিস্ট্রার একটি তালাকনামা ইস্যু করেন, যা ভবিষ্যতে যেকোনো আইনি বা প্রশাসনিক কাজে (যেমন পুনর্বিবাহ, ভিসা আবেদন, সন্তানের কাস্টডি মামলা) প্রয়োজন হতে পারে।
২০২৬ সালের সাম্প্রতিক আপডেট: তালাক নিবন্ধন ফি বৃদ্ধি
আইন ও বিচার বিভাগ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯ সংশোধন করেছে, যা ২০২৬ সালের শুরু থেকে কার্যকর হয়েছে। এই সংশোধনীর ফলে তালাক ও বিবাহ নিবন্ধনের ফি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
মূল পরিবর্তনগুলো হলো:
- একজন নিকাহ রেজিস্ট্রার আগে তালাক নিবন্ধনের জন্য সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা ফি নিতে পারতেন। সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী এই ফি বেড়ে ১,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
- বিবাহ নিবন্ধন ফিও দেনমোহরের পরিমাণের ভিত্তিতে বাড়ানো হয়েছে—৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দেনমোহরের ক্ষেত্রে প্রতি হাজারে হার ১২.৫০ টাকা থেকে বেড়ে ১৪ টাকা করা হয়েছে, এবং ৫ লাখের বেশি দেনমোহরের ক্ষেত্রে পরবর্তী প্রতি লাখে ফি দ্বিগুণ (১০০ থেকে ২০০ টাকা) করা হয়েছে।
এই পরিবর্তনের ফলে যারা ২০২৬ সালে তালাক নিবন্ধন করাতে যাচ্ছেন, তাদের আগের তুলনায় বেশি ফি গুনতে হবে। নিবন্ধনের আগে স্থানীয় নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছে হালনাগাদ ফি চার্ট জেনে নেওয়া ভালো, কারণ এলাকাভেদে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে।
সংক্ষেপে সারমর্ম
| ধাপ | বিবরণ | সময়সীমা |
|---|---|---|
| তালাক উচ্চারণ | স্বামী/স্ত্রী (তাফবিজ থাকলে)/উভয় পক্ষ | তাৎক্ষণিক |
| লিখিত নোটিশ | চেয়ারম্যান/মেয়র ও অপর পক্ষকে | তালাকের পরপরই |
| সালিশি পরিষদ | সমঝোতার চেষ্টা | ৯০ দিনের মধ্যে |
| ইদ্দতকাল | তালাক কার্যকরের অপেক্ষা | ৯০ দিন |
| সার্টিফিকেট গ্রহণ | চেয়ারম্যান/মেয়রের কাছ থেকে | ৯০ দিন পর |
| তালাক নিবন্ধন | নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছে | সার্টিফিকেট পাওয়ার পর |
শেষ কথা
বাংলাদেশে ডিভোর্স একটি সংবেদনশীল কিন্তু সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত প্রক্রিয়া। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুসরণ করে সঠিক নিয়মে নোটিশ পাঠানো, ৯০ দিনের ইদ্দতকাল পার করা এবং যথাযথ নিবন্ধন সম্পন্ন করলে ভবিষ্যতে কোনো আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হয় না। প্রতিটি পরিবার ও পরিস্থিতি ভিন্ন হওয়ায়, জটিল বা বিরোধপূর্ণ ক্ষেত্রে একজন অভিজ্ঞ পারিবারিক আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।


