বিবাহ বিচ্ছেদের (ডিভোর্স) পর একজন স্ত্রী তার পাওনা দেনমোহর (Dower/Mahr) এবং ইদ্দতকালীন খোরপোষ (Maintenance during Iddah) পাওয়ার আইনগত ও ধর্মীয় অধিকার রাখেন। বাংলাদেশের ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ (Muslim Family Laws Ordinance) এবং ১৯৭৪ সালের দেনমোহর আইন অনুযায়ী এর স্পষ্ট নিয়ম নির্ধারণ করা রয়েছে।

নিচে দেনমোহর ও ইদ্দতকালীন অর্থ পাওয়ার নিয়ম ও আইনি প্রক্রিয়া বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. দেনমোহর পাওয়ার নিয়ম ও পরিমাণ
দেনমোহর হলো বিবাহের সময় নির্ধারিত অর্থ বা সম্পত্তি, যা পরিশোধ করা স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক আইনি ও ধর্মীয় দায়িত্ব।
কখন ও কতটুকু পাওনা হয়?
- বিবাহ সম্পন্ন হলে: স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্ক (Consummation of Marriage) স্থাপিত হয়ে থাকলে বিচ্ছেদের পর স্ত্রী সম্পূর্ণ দেনমোহর পাবেন।
- দাম্পত্য সম্পর্ক না হলে: বিয়ের পর দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার আগেই বিচ্ছেদ ঘটলে স্ত্রী নির্ধারিত দেনমোহরের অর্ধেক (৫০%) পাবেন।
- কে ডিভোর্স দিল তা মুখ্য নয়: স্বামী ডিভোর্স দিক বা স্ত্রী নিজে থেকে ডিভোর্স (তফউইজ ক্ষমতা বলে) দিক—স্ত্রী তার দেনমোহরের টাকা পাওয়ার সম্পূর্ণ অধিকারী। (ব্যতিক্রম: স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় দেনমোহর মাফ করে দেন বা 'খোলা' ডিভোর্সের মাধ্যমে দেনমোহর মওকুফের শর্তে বিচ্ছেদ করেন।)
দেনমোহরের ধরন:
১. মুয়াজ্জল (Prompt Dower): এটি স্ত্রী চাওয়ামাত্রই স্বামী পরিশোধ করতে বাধ্য।
২. মুয়াজ্জল বা স্থগিত (Deferred Dower): এটি সাধারণত বিবাহ বিচ্ছেদ বা স্বামীর মৃত্যুর পর পরিশোধযোগ্য হয়। বিচ্ছেদ হওয়া মাত্রই পুরো স্থগিত দেনমোহর বকেয়া (Debt) হিসেবে গণ্য হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে আদায়যোগ্য হয়।
২. ইদ্দতকালীন খোরপোষ পাওয়ার নিয়ম
ডিভোর্স কার্যকর হওয়ার পর স্ত্রীকে আইন অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত 'ইদ্দত' পালন করতে হয়। এই সময়টাতে তার ভরণপোষণ দেওয়ার দায়িত্ব স্বামীর।
ইদ্দতের মেয়াদ কতদিন?
- সাধারণ ক্ষেত্রে: ডিভোর্সের নোটিশ পাওয়ার পর থেকে ৩টি ঋতুস্রাব (Mensuration cycles) বা আনুমানিক ৯০ দিন (৩ মাস)।
- গর্ভবতী হলে: স্ত্রী যদি ডিভোর্সের সময় গর্ভবতী থাকেন, তবে ইদ্দতের মেয়াদ হবে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত। সন্তান প্রসব না হওয়া পর্যন্ত স্বামী স্ত্রী ও অনাগত সন্তানের যাবতীয় খোরপোষ দিতে বাধ্য।
ইদ্দতকালে কী কী খরচ পাবেন?
- খোরপোষের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত—স্ত্রীর বাসস্থান, পর্যাপ্ত খাবার, পোশাক এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা খরচ।

৩. টাকা আদায়ের আইনি প্রক্রিয়া (যদি স্বামী দিতে না চায়)
স্বামী যদি স্বেচ্ছায় দেনমোহর ও ইদ্দতকালীন অর্থ না দেয়, তবে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা আদায় করা সম্ভব:
১. আইনি নোটিশ প্রেরণ (Legal Notice):পারিবারিক আপসের প্রথম ধাপ। জেলা লিগ্যাল এইডে গিয়ে আপোষের জন্যে অভিযোগ দায়ের করতে হবে।
প্রথমেই একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে স্বামীকে লিখিত 'আইনি নোটিশ' পাঠাতে হবে। নোটিশে নির্দিষ্ট সময়ের (যেমন: ১৫ বা ৩০ দিন) মধ্যে বকেয়া দেনমোহর ও ইদ্দতের টাকা পরিশোধের আহ্বান জানানো হয়।
২. পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের (Family Court Suit):আইনি লড়াই শুরু.
নোটিশের পর স্বামী টাকা পরিশোধ না করলে ১৯৮৫ সালের পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ অনুযায়ী স্থানীয় পারিবারিক আদালতে (Family Court) মামলা দায়ের করতে হবে।
৩. প্রমানপত্র পেশ ও শুনানি:আদালতি বিচার প্রক্রিয়া.
আদালতে কাবিননামা (নিকাহনামা), ডিভোর্স নোটিশ এবং ইদ্দত পালনের তথ্য প্রমাণ হিসেবে পেশ করতে হয়। শুনানি শেষে আদালত স্বামী কত টাকা দেনমোহর ও খোরপোষ বাবদ দেবেন তা নির্ধারণ করে রায় দেন।
4.৪. ডিগ্রি জারি ও ক্রোকি পরোয়ানা (Execution of Decree):টাকা আদায়ে আইনি প্রয়োগ.
আদালতের রায়ের পরও স্বামী টাকা না দিলে আদালতের মাধ্যমে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক (Seizure) করে বা স্বামীকে গ্রেফতার বা কারাদণ্ড দিয়ে দেনমোহরের টাকা আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
- মামলা দায়েরের সময়সীমা (Limitation): ডিভোর্স কার্যকর হওয়ার পর থেকে ৩ বছরের মধ্যে দেনমোহর আদায়ের মামলা করতে হয়। ৩ বছর পার হয়ে গেলে মামলা পরিচালনা আইনি জটিলতায় পড়তে পারে।
- মামলার খরচ: দেনমোহরের মামলা দায়ের করতে আদালত ফি অত্যন্ত সামান্য (সর্বোচ্চ কয়েকটি নির্ধারিত স্কেল অনুযায়ী)।


