জমি কেনা-বেচার ক্ষেত্রে দলিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল। দলিলে ছোট একটি ভুলও ভবিষ্যতে বড় ঝামেলার কারণ হতে পারে—মামলা, দলিল জটিলতা, মালিকানা দ্বন্দ্বসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই দলিল রেজিস্ট্রেশনের পরে যদি কোনো ভুল ধরা পড়ে, সেটি যত দ্রুত সম্ভব সংশোধন করা জরুরি।
এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিতভাবে জানব—দলিলে কী কী ধরনের ভুল হতে পারে, কোন ভুল কীভাবে সংশোধন করতে হয়, ভ্রম সংশোধন দলিল কী, আদালতের মাধ্যমে সংশোধনের নিয়ম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ফি, সময়সীমা, আইনগত বিধান, এবং বাস্তবে মানুষ কোন ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি করে থাকে।
দলিলে ভুল কীভাবে হয়ে থাকে?
দলিলে সাধারণত দুই ধরনের ভুল দেখা যায়—
১. সাধারণ বা করণিক ভুল (Minor Errors)
যেমন—
- দাগ নম্বর ভুল
- খতিয়ান নম্বর ভুল
- মৌজার নাম ভুল
- চৌহদ্দিতে ছোট ভুল
- নামের বানান ভুল
- জমির পরিমাণ লেখায় বানানগত ভুল
এসব ভুল দলিলের স্বত্ব বা মালিকানা পরিবর্তন করে না।
২. গুরুতর বা স্বত্ব-সংক্রান্ত ভুল (Major Errors)
যেমন—
- ভূমির পরিমাণ ভুলভাবে কম-বেশি লেখা
- বিক্রিত অংশের বর্ণনায় বড় গরমিল
- মালিকানার ধারায় ভুল তথ্য
- ভুল ব্যক্তিকে বিক্রেতা/গ্রহীতা দেখানো
- জমির প্রকৃতি ভুল উল্লেখ
এসব ভুল দলিলের মূল কাঠামো ও স্বত্বকে প্রভাবিত করে। এ ধরনের ভুল সাধারণত সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে সংশোধন করা যায় না; আদালতে মামলা করতে হয়।
দলিলে ভুল সংশোধনের দুটি পদ্ধতি
দলিলে ভুল সংশোধনের জন্য মূলত দুইটি পথ অনুসরণ করতে হয়:
পদ্ধতি–১: সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের মাধ্যমে ভ্রম সংশোধন দলিল (Rectification Deed)
এই পদ্ধতিতে ছোটখাটো বা করণিক ভুল সংশোধন করা যায়।
যেমন—
- নামের বানান ভুল
- দাগ ও খতিয়ান নম্বরের ভুল
- জমির সীমা বর্ণনায় ত্রুটি
- মৌজা বা জে.এল. নম্বর ভুল
- চৌহদ্দি ভুল
কারা করতে পারবেন?
ভ্রম সংশোধন দলিল করতে হবে—
- দাতা (Seller)
- গ্রহীতা (Buyer)
—উভয়ের সম্মতিতে।
দাতা ও গ্রহীতা উভয়েই উপস্থিত থাকলে সংশোধন সহজ হয়।
ভ্রম সংশোধন দলিল করার ধাপসমূহ
ভ্রম সংশোধন দলিল করার প্রক্রিয়া মূলত দাতা ও গ্রহীতার পারস্পরিক সম্মতির ওপর ভিত্তি করে সম্পন্ন হয়। প্রথমে ভুল অংশ শনাক্ত করে উভয় পক্ষকে সংশোধনে সম্মত হতে হয়। এরপর একজন দলিল লেখক বা নথিকারকে দিয়ে নতুন ভ্রম সংশোধন দলিলের খসড়া প্রস্তুত করা হয়, যেখানে ভুল তথ্য ও সঠিক তথ্য পরিষ্কারভাবে উল্লেখ থাকে। তারপর দাতা ও গ্রহীতা উভয়েই সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে উপস্থিত হয়ে দলিলে সই করেন। নির্ধারিত স্ট্যাম্প ও রেজিস্ট্রেশন ফি প্রদান শেষে সংশোধিত দলিলটি আনুষ্ঠানিকভাবে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়।
১. ভুল শনাক্ত করা ও উভয় পক্ষের সম্মতি নেওয়া
প্রথমে ভুলটি লিখিতভাবে চিহ্নিত করুন। তারপর দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের সম্মতি নিতে হবে।
২. ভ্রম সংশোধন দলিল খসড়া তৈরি
এটি একজন দলিল লেখক/নথিকার বা আইনজীবীর মাধ্যমে করা যায়। ভুল অংশটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে সংশোধিত তথ্য সংযুক্ত করতে হয়।
৩. সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে গিয়ে দলিল সম্পাদন
উভয় পক্ষকে অফিসে গিয়ে সই করতে হয়। সাব-রেজিস্ট্রার দলিল যাচাই করে রেজিস্ট্রেশন অনুমোদন করেন।
৪. স্ট্যাম্প ও রেজিস্ট্রেশন ফি পরিশোধ
সাধারণত ভ্রম সংশোধন দলিলে বড় স্ট্যাম্প ডিউটি লাগেনা। কিছু ক্ষেত্রে স্ট্যাম্প ডিউটি মওকুফও থাকে (অফিস অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে)।
ভ্রম সংশোধন দলিলের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
- মূল দলিলের কপি
- ভুল-বর্ণিত তথ্যের প্রমাণ (যদি থাকে)
- দাতা ও গ্রহীতার জাতীয় পরিচয়পত্র
- ফটোগ্রাফ
- রেজিস্ট্রেশন ফি
- স্ট্যাম্প মূল্য
কখন ভ্রম সংশোধন দলিল করা যাবে না?
- দাতা মারা গেলে
- দাতা/গ্রহীতা কেউ রাজি না হলে
- স্বত্ব বা মালিকানা পরিবর্তন হয় এমন ভুল হলে
- মূল বর্ণনায় গরমিল থাকলে
- জমির পরিমাণে বড় ধরনের ভুল থাকলে
এসব ক্ষেত্রে আদালতের শরণাপন্ন হতে হবে।
পদ্ধতি–২: দেওয়ানি আদালতে মামলা করে দলিল সংশোধন
কিছু ভুল এত গুরুতর হয় যে সাব-রেজিস্ট্রার অফিস তা ঠিক করতে পারে না।এ গুলি সাধারণত মালিকানা, জমির পরিমাণ বা স্বত্ব সংক্রান্ত ভুল। এ ধরনের ভুলের ক্ষেত্রে দেওয়ানি আদালতে মামলা করতে হয়।
কখন আদালতে মামলা করতে হবে?
- দাতা ভ্রম সংশোধন দলিলে সই করতে রাজি না হলে
- দাতা মারা গেলে
- ভুলটি গুরুতর হলে
- মালিকানায় বিভ্রান্তি তৈরি হলে
- জমির অবস্থান/ভূমির প্রকৃতি ভুলভাবে লিখলে
- দাগ/খতিয়ান/মৌজায় বড় ধরনের ভুল হলে
কোন আইনে মামলা হয়?
Specific Relief Act, 1877 – Section 31 এই ধারায় দলিল সংশোধনের মোকদ্দমা (Suit for Rectification of Instrument) দায়ের করা হয়।
মামলা করার সময়সীমা (Limitation Period)
→ ভুল ধরা পড়ার তারিখ থেকে ৩ বছরের মধ্যে মামলা করতে হবে।
→ ৩ বছর পর দলিল সংশোধন মামলা তামাদি (time-barred) হয়ে যায়।
তবে বিশেষ ক্ষেত্রে Declaratory Suit করা যায় যেখানে ঘোষণার মাধ্যমে সংশোধন আদেশ নেওয়া সম্ভব।
দলিল সংশোধনের মামলা করার ধাপসমূহ
১. অভিজ্ঞ সিভিল আইনজীবী নিয়োগ
দলিল আইন ও ভূমি আইনে অভিজ্ঞ একজন আইনজীবী নির্বাচন করুন।
২. দলিল, ভুল তথ্যের প্রমাণ ও কাগজপত্র সংগ্রহ
যেমন—
- মূল দলিল
- ভূমির রেকর্ড (খতিয়ান)
- দাখিলা
- নকশা
- ভুলের লিখিত ব্যাখ্যা
৩. সংশ্লিষ্ট দেওয়ানি আদালতে মামলা দায়ের
আইনজীবী মামলা প্রস্তুত করে আদালতে দাখিল করেন।
৪. আদালতের শুনানি ও রায়
আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে ভুল সংশোধনের নির্দেশ দেন।
দলিলে যেসব ভুল সবচেয়ে বেশি দেখা যায় (বাংলাদেশে সাধারণ ভুল)
১. দাগ ও খতিয়ান নম্বর ভুল
সাধারণ ভুল হলেও জটিলতা তৈরি করে।
২. ভুল চৌহদ্দি উল্লেখ
ভূমির সীমানা ভুল লেখা থাকলে ভবিষ্যতে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
৩. জমির পরিমাণ ভুল
২০ শতক লেখা হওয়ার কথা, কিন্তু লেখা হলো ৩০ শতক—এ ধরনের ভুল গুরুতর।
৪. নামের বানান ভুল
জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে মিল না থাকলে সমস্যা তৈরি হয়।
৫. দলিল লেখার সময় তথ্য কপি করতে ভুল
এটিই সবচেয়ে বেশি হয়।
৬. মৌজার নাম ভুল বা অসম্পূর্ণ লেখা
এসব ভুল ভূমি রেকর্ডের সাথে অসামঞ্জস্য তৈরি করে।
দলিল সংশোধনের ক্ষেত্রে কার্যকর টিপস
- দলিল রেজিস্ট্রেশনের পরপরই নকল তুলুন এবং ভুল আছে কি না দেখুন।
- ভুল মিলিয়ে নিতে “ডাটা এন্ট্রি রেকর্ড” যাচাই করুন।
- সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে দ্রুত যোগাযোগ করুন।
- ছোট ভুল হলে “Rectification Deed” পদ্ধতি বেছে নিন।
- বড় ভুল হলে সময় নষ্ট না করে সিভিল কোর্টে মামলা করুন।
ভুল না হওয়ার জন্য করণীয় — প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা
- দলিল লেখককে তথ্য দেওয়ার সময় NID, দাখিলা, খতিয়ান দেখে তথ্য দিন
- নাম বাংলায় ও ইংরেজিতে ঠিক আছে কি না দেখুন
- জমির নকশা ও দাগ-খতিয়ান তথ্য একাধিকবার যাচাই করুন
- দলিলের খসড়া (Draft Deed) ভালো করে পড়ুন
- রেজিস্ট্রেশনের আগে চৌহদ্দি মিলিয়ে নিন
উপসংহার
দলিলে ভুল থাকলে তা সময়মতো সংশোধন না করলে ভবিষ্যতে বড় জটিলতা তৈরি হতে পারে। ছোট ভুল হলে “ভ্রম সংশোধন দলিল” করেই সমাধান সম্ভব, আর গুরুতর ভুল হলে “দেওয়ানি আদালতে মামলা” করতে হয়। আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সংশোধন করা অত্যন্ত জরুরি। সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে দলিল সংশোধন করা কঠিন নয়।



