বাংলাদেশে বাসা বা বাণিজ্যিক স্পেস ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রে ‘ভাড়ার চুক্তিপত্র’ বা Rent Agreement কেবল একটি কাগজের টুকরো নয়; এটি মালিক ও ভাড়াটিয়া উভয়ের জন্য একটি আইনি রক্ষাকবচ। ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে প্রতিনিয়ত ভাড়াটিয়া ও মালিকের মধ্যে যে ছোট-বড় বিরোধ হয়, তার প্রধান কারণ হলো একটি সুস্পষ্ট ও লিখিত চুক্তির অভাব।
এই গাইডে আমরা জানবো ভাড়ার চুক্তিপত্র কী, কেন এটি অপরিহার্য, এটি তৈরির সঠিক নিয়ম এবং এতে কী কী শর্ত থাকা বাধ্যতামূলক।
ভাড়ার চুক্তিপত্র কী? (Definition & Legal Context)
সহজ কথায়, ভাড়ার চুক্তিপত্র হলো বাড়ির মালিক (Landlord) এবং ভাড়াটিয়ার (Tenant) মধ্যে সম্পাদিত একটি লিখিত আইনি দলিল। এই দলিলে উল্লেখ থাকে যে, মালিক তার সম্পত্তি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে ভাড়াটিয়াকে ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছেন।
আইনি ভিত্তি
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই চুক্তিটি মূলত ‘বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১’ (Premises Rent Control Act, 1991) এবং ‘সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২’ (Transfer of Property Act, 1882) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। একটি বৈধ চুক্তিপত্র আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য এবং যে কোনো বিরোধ নিষ্পত্তিতে এটি রেফারেন্স হিসেবে কাজ করে।
এটি দুই ধরনের হতে পারে:
- Residential Rent Agreement (আবাসিক): পরিবারের বসবাসের জন্য।
- Commercial Rent Agreement (বাণিজ্যিক): দোকান, অফিস বা গোডাউনের জন্য।
কেন ভাড়ার চুক্তিপত্র প্রয়োজন?
অনেকে মুখের কথার ওপর ভিত্তি করে বাসা ভাড়া দিয়ে দেন, যা পরবর্তীতে বড় বিপদের কারণ হতে পারে। নিচে এর প্রয়োজনীয়তাগুলো আলোচনা করা হলো:
১. বিরোধ নিষ্পত্তি (Conflict Resolution)
ভবিষ্যতে ভাড়া বৃদ্ধি, বাসা ছাড়ার নোটিশ বা মেরামতের খরচ নিয়ে তর্ক হলে, এই চুক্তিপত্রই একমাত্র সমাধান। চুক্তিতে যা লেখা থাকবে, আইনত সেটাই মানতে হবে।
২. আইনি সুরক্ষা ও প্রমাণ (Legal Safety)
মালিকের জন্য এটি নিশ্চিত করে যে ভাড়াটিয়া তার সম্পত্তি দখল করে নেবে না। আর ভাড়াটিয়ার জন্য এটি নিশ্চিত করে যে মালিক চাইলেই তাকে হুট করে উচ্ছেদ করতে পারবে না।
৩. পুলিশ ভেরিফিকেশন ও নিরাপত্তা (Security)
বর্তমানে মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোতে ভাড়াটিয়ার তথ্য পুলিশকে জানানো বাধ্যতামূলক। একটি বৈধ চুক্তিপত্র থাকলে পুলিশ ভেরিফিকেশন সহজ হয় এবং ভাড়াটিয়া কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ালে মালিক দায়মুক্ত থাকতে পারেন।
৪. ঠিকানা প্রমাণ (Address Proof)
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, পাসপোর্ট তৈরি, ট্রেড লাইসেন্স বা গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগ নিতে ভাড়াটিয়ার জন্য এই চুক্তিপত্রটি ‘ভ্যালিড অ্যাড্রেস প্রুফ’ হিসেবে কাজ করে।
জেনে নিনঃচুক্তি ভঙ্গের প্রতিকার: আইনি অধিকার
ভাড়ার চুক্তিপত্রে প্রয়োজনীয় মূল উপাদান
একটি আদর্শ চুক্তিপত্রে নিচের ৯টি উপাদান বা শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। অস্পষ্টতা থাকলেই ভবিষ্যতে ঝামেলার সৃষ্টি হয়।
১. পক্ষদ্বয়ের পরিচয় (Entities)
চুক্তির শুরুতে দুটি পক্ষের বিস্তারিত পরিচয় থাকতে হবে:
- প্রথম পক্ষ (মালিক): নাম, বাবার নাম, স্থায়ী ঠিকানা এবং জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নম্বর।
- দ্বিতীয় পক্ষ (ভাড়াটিয়া): নাম, বাবার নাম, স্থায়ী ঠিকানা, পেশা এবং NID নম্বর।
২. সম্পত্তির বিবরণ (Property Attributes)
যে বাসা বা দোকানটি ভাড়া দেওয়া হচ্ছে তার নিখুঁত বর্ণনা থাকতে হবে। একে আইনি ভাষায় ‘তফশিল’ বলা হয়।
- সম্পত্তির পূর্ণ ঠিকানা (হোল্ডিং নম্বর, রোড, এলাকা)।
- ফ্ল্যাট বা দোকানের অবস্থান (কত তলা, কোন সাইড)।
- আয়তন (স্কয়ার ফিট)।
- ফিক্সচার বা সুবিধাসমূহ (কয়টি ফ্যান, লাইট, গিজার বা এসি দেওয়া হচ্ছে তার তালিকা)।
৩. ভাড়ার পরিমাণ ও শর্ত (Financial Attributes)
টাকা-পয়সার বিষয়টি সবচেয়ে পরিষ্কার থাকা জরুরি:
- মাসিক ভাড়া: মোট কত টাকা।
- প্রদানের তারিখ: প্রতি মাসের কত তারিখের মধ্যে ভাড়া দিতে হবে (যেমন: ১ থেকে ৭ তারিখের মধ্যে)।
- পেমেন্ট মোড: নগদে, চেকে নাকি ব্যাংক ট্রান্সফারে।
- বিলম্ব জরিমানা (Late Fee): নির্ধারিত তারিখের পরে ভাড়া দিলে কোনো জরিমানা হবে কি না।
৪. জামানত বা অ্যাডভান্স (Security Deposit)
- পরিমাণ: কত মাসের ভাড়া অগ্রিম হিসেবে নেওয়া হচ্ছে। (আইন অনুযায়ী ১ মাসের বেশি অগ্রিম নেওয়া নিষেধ হলেও, বাস্তবে ২-৩ মাসের অগ্রিম প্রচলিত)।
- ফেরত নীতি: বাসা ছাড়ার সময় এই টাকা ভাড়ার সাথে সমন্বয় হবে, নাকি মালিক চেক/নগদে ফেরত দেবেন।
৫. চুক্তির মেয়াদ (Time Attribute)
- চুক্তিটি কবে শুরু হচ্ছে এবং কবে শেষ হবে।
- সাধারণত বাংলাদেশে ১১ মাসের চুক্তি বেশি হয় (এর আইনি কারণ নিচে ব্যাখ্যা করা হয়েছে)।
- নবায়ন (Renewal): মেয়াদ শেষ হলে নতুন করে চুক্তি হবে কি না বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন হবে কি না।
৬. ইউটিলিটি বিল (Utility Responsibilities)
কে কোন বিল পরিশোধ করবে তা নির্দিষ্ট করুন:
- বিদ্যুৎ বিল (প্রিপেইড না পোস্টপেইড?)।
- গ্যাস ও পানির বিল।
- সার্ভিস চার্জ (লিফট, জেনারেটর, দারোয়ান)।
- সিটি কর্পোরেশন ট্যাক্স (সাধারণত মালিক বহন করেন)।
৭. রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত (Maintenance Predicate)
এটি নিয়েই সবচেয়ে বেশি তর্ক হয়। আদর্শ নিয়ম হলো:
- Major Repairs: কাঠামোগত সমস্যা, দেওয়ালের ড্যাম্প, বা পানির পাইপ ফেটে গেলে—খরচ মালিকের।
- Minor Repairs: ফিউজ নষ্ট হওয়া, কল (Tap) লিক করা বা ব্যবহারজনিত ক্ষয়ক্ষতি—খরচ ভাড়াটিয়ার।
৮. নিষেধাজ্ঞা ও বিধি (Restrictions)
মালিকের পক্ষ থেকে কোনো বিশেষ শর্ত থাকলে তা লিখুন:
- সাবলেট (Sublet): ভাড়াটিয়া অন্য কাউকে সাবলেট দিতে পারবে কি না।
- বসবাসকারী: কতজন লোক থাকবেন বা মেস মেম্বার রাখা যাবে কি না।
- পোষা প্রাণী (Pets): বিড়াল/কুকুর রাখা যাবে কি না।
- বাণিজ্যিক ব্যবহার: বাসায় অফিস বা গোডাউন করা যাবে কি না।
৯. চুক্তি বাতিল ও উচ্ছেদ (Termination Conditions)
- নোটিশ পিরিয়ড: বাসা ছাড়তে চাইলে ভাড়াটিয়াকে কতদিন আগে জানাতে হবে (সাধারণত ১ বা ২ মাস)।
- মালিক যদি ভাড়াটিয়াকে নামিয়ে দিতে চান, তবে তাকেও কতদিন আগে নোটিশ দিতে হবে।
- তাৎক্ষণিক বাতিলের শর্ত (যেমন: অবৈধ কাজ করলে বা পরপর ৩ মাস ভাড়া বকেয়া থাকলে)।
ভাড়ার চুক্তিপত্র তৈরি করার ধাপ
সঠিকভাবে একটি লিগ্যাল ডকুমেন্ট তৈরির ধাপগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- খসড়া তৈরি (Drafting): প্রথমে সাদা কাগজে বা কম্পিউটারে শর্তগুলো লিখে উভয় পক্ষ আলোচনা করে ঠিক করে নিন।
- স্ট্যাম্প পেপার ক্রয়: সরকার অনুমোদিত ভেন্ডারের কাছ থেকে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প পেপার কিনুন। বাংলাদেশে সাধারণত ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে ভাড়ার চুক্তি করা হয়।
- প্রিন্টিং: চূড়ান্ত খসড়াটি স্ট্যাম্প পেপারে প্রিন্ট করুন।
- স্বাক্ষর (Signing): মালিক ও ভাড়াটিয়া উভয়কে স্ট্যাম্পের প্রতি পাতায় স্বাক্ষর করতে হবে।
- সাক্ষী (Witnesses): অন্তত দুইজন সাক্ষীর স্বাক্ষর ও তাদের মোবাইল নম্বর/NID থাকতে হবে।
- নোটারি (Notary): এটি বাধ্যতামূলক না হলেও, একজন নোটারি পাবলিক (আইনজীবী) দিয়ে ‘নোটারি’ করিয়ে নিলে দলিলের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে।
ভাড়ার চুক্তিপত্রের নমুনা (Sample Rent Agreement in Bengali)
নিচে একটি সাধারণ বাড়ি ভাড়ার চুক্তিনামার ফরম্যাট দেওয়া হলো। এটি ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে প্রিন্ট করতে হবে।
(প্রথম পাতা – ১০০ টাকার স্ট্যাম্প)
বরাবর, প্রথম পক্ষ (বাড়িওয়ালা): নাম: ……………………………………………….. পিতা: ……………………………………………….. ঠিকানা: ……………………………………………… জাতীয় পরিচয়পত্র নং: ………………………………
দ্বিতীয় পক্ষ (ভাড়াটিয়া): নাম: ……………………………………………….. পিতা: ……………………………………………….. স্থায়ী ঠিকানা: ………………………………………. পেশা: ……………………………………………….. জাতীয় পরিচয়পত্র নং: ………………………………
অদ্য ……………………. তারিখে আমরা উভয় পক্ষ নিম্নললিখিত শর্ত সাপেক্ষে অত্র বাড়ি ভাড়া চুক্তিপত্র সম্পাদন করলাম।
(দ্বিতীয় পাতা – ১০০ টাকার স্ট্যাম্প)
শর্তাবলি:
১. অত্র চুক্তিপত্রটি আগামী ………………. তারিখ হতে ………………. তারিখ পর্যন্ত মোট …….. (কথায়) বছরের/মাসের জন্য বলবৎ থাকিবে।
২. ভাড়াকৃত অংশ: বাড়ির ……. তলার ……… পাশের ফ্ল্যাটটি (২টি বেডরুম, ১টি বাথ, ১টি কিচেন)।
৩. মাসিক ভাড়া ………………. (কথায়: ……………….) টাকা ধার্য করা হলো। প্রতি মাসের ০৭ তারিখের মধ্যে ভাড়াটিয়া বাড়িওয়ালার নিকট বা ব্যাংক একাউন্টে ভাড়া পরিশোধ করবেন।
৪. জামানত হিসেবে ২য় পক্ষ ১ম পক্ষকে ………………. টাকা প্রদান করলেন, যা চুক্তি শেষে ফেরতযোগ্য/সমন্বয়যোগ্য।
৫. বিদ্যুৎ বিল ২য় পক্ষ মিটার অনুযায়ী পরিশোধ করবেন। গ্যাস ও পানির বিল ভাড়ার অন্তর্ভুক্ত/আলাদা (কে দেবে উল্লেখ করুন)।
৬. ২য় পক্ষ ফ্ল্যাটের কোনো স্থায়ী কাঠামো পরিবর্তন করতে পারবেন না। তবে নিজের প্রয়োজনে অস্থায়ী ডেকোরেশন করতে পারবেন।
(তৃতীয় পাতা – ১০০ টাকার স্ট্যাম্প)
৭. যদি কোনো পক্ষ চুক্তি বাতিল করতে চান, তবে অপর পক্ষকে অন্তত ২ (দুই) মাস পূর্বে লিখিত নোটিশ প্রদান করতে হবে।
৮. ভাড়াটিয়া অসামাজিক বা রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত হতে পারবেন না। হলে এর দায় সম্পূর্ণ ২য় পক্ষের।
৯. এই চুক্তিপত্রের মেয়াদ শেষে উভয় পক্ষের সম্মতিতে নতুন ভাড়ার হার নির্ধারণ করে চুক্তি নবায়ন করা যাবে।
আমরা উভয় পক্ষ সজ্ঞানে, সুস্থ মস্তিষ্কে, অন্যের বিনা প্ররোচনায় অত্র চুক্তিপত্র পাঠ করে মর্ম অনুধাবন করে নিজ নিজ নাম সহি সম্পাদন করলাম।
স্বাক্ষর:
(প্রথম পক্ষ/বাড়িওয়ালা)
(দ্বিতীয় পক্ষ/ভাড়াটিয়া)
সাক্ষীগণের স্বাক্ষর:
১. ………………………………………………..
২. ………………………………………………..
ভাড়ার চুক্তির সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য দস্তাবেজ
চুক্তিপত্রের সাথে নিচের কাগজগুলো যুক্ত করে একটি ফাইল মেইনটেইন করা উচিত:
- পুলিশ ভেরিফিকেশন ফর্ম: বিশেষ করে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় এটি বাধ্যতামূলক। ডিএমপি (DMP) ওয়েবসাইটে এটি পাওয়া যায়।
- NID কপি: উভয় পক্ষের এনআইডি ফটোকপি।
- ছবি: ভাড়াটিয়া ও তার পরিবারের সদস্যদের পাসপোর্ট সাইজ ছবি।
- রসিদ বই: ভাড়া আদান-প্রদানের প্রমাণ।
ভাড়ার চুক্তিপত্র রেজিস্ট্রি কি বাধ্যতামূলক? (Legal Nuance)
এখানে একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্যাঁচ আছে যা অনেকেরই অজানা।
রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ (Registration Act, 1908)-এর ১৭ ধারা অনুযায়ী, কোনো স্থাবর সম্পত্তির ভাড়ার মেয়াদ যদি ১ বছর বা তার বেশি হয়, তবে সেই চুক্তিপত্রটি সাব-রেজিস্ট্রারের অফিসে গিয়ে রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক।
১১ মাসের চুক্তির কৌশল:
রেজিস্ট্রি করতে গেলে ভাড়ার টাকার ওপর ভিত্তি করে উচ্চ হারে ‘স্ট্যাম্প ডিউটি’ ও ‘রেজিস্ট্রেশন ফি’ দিতে হয়। এই খরচ ও আইনি জটিলতা এড়ানোর জন্য বাংলাদেশে বেশিরভাগ ভাড়ার চুক্তি ১১ মাসের জন্য করা হয়। ১১ মাসের চুক্তি রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক নয়, শুধু ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে নোটারি করলেই চলে।
ভাড়ার চুক্তিপত্রে সাধারণ ভুলগুলো (Common Mistakes)
চুক্তি করার সময় নিচের ভুলগুলো এড়িয়ে চলুন:
- ভাড়ার পরিমাণ স্পষ্ট না করা: সব খরচ (ইউটিলিটি, সার্ভিস চার্জ) ভাড়ার অন্তর্ভুক্ত নাকি আলাদা, তা না লেখা।
- ইনভেন্টরি লিস্ট না থাকা: বাসায় ঢোকার সময় ফ্যান, লাইট বা ফিটিংস কী অবস্থায় ছিল, তার তালিকা না করা। পরবর্তীতে মালিক দাবি করতে পারেন যে ভাড়াটিয়া এগুলো নষ্ট করেছে।
- Exit Clause না থাকা: হঠাৎ চাকরি চলে গেলে বা ট্রান্সফার হলে ভাড়াটিয়া কীভাবে বাসা ছাড়বে, সেই শর্ত না রাখা।
- ভাড়া বৃদ্ধির হার উল্লেখ না করা: এক বছর পর ভাড়া কত বাড়বে (যেমন ৫% বা ১০%), তা আগে থেকে ঠিক না করা।
ভাড়ার চুক্তিপত্রের ঝুঁকি ও বিরোধের কারণ
চুক্তি থাকার পরেও কিছু কারণে বিরোধ হতে পারে:
- জামানত ফেরত: বাসা ছাড়ার সময় মালিকরা প্রায়ই ঠুনকো অজুহাতে জামানতের টাকা কাটতে চান। এজন্য চুক্তিতে ‘স্বাভাবিক ক্ষয়ক্ষতি’ (Normal Wear and Tear) মেনে নেওয়ার শর্ত থাকা উচিত।
- নোটিশ ছাড়া উচ্ছেদ: মালিক চাইলেই পুলিশ ডেকে ভাড়াটিয়া বের করে দিতে পারেন না। তাকে অবশ্যই লিখিত নোটিশ দিতে হবে।
- তালাবদ্ধ করা: ভাড়া বকেয়া থাকলেও মালিক ভাড়াটিয়ার ঘরে তালা দিতে পারেন না; এটি ফৌজদারি অপরাধ।
কাদের দিয়ে চুক্তিপত্র তৈরি করবেন?
- নিজে: সাধারণ আবাসিক ভাড়ার জন্য অনলাইনে ভালো মানের টেমপ্লেট দেখে নিজেই ড্রাফট করতে পারেন।
- আইনজীবী: বাণিজ্যিক ভাড়ার ক্ষেত্রে বা বড় অংকের লেনদেন থাকলে অবশ্যই আইনজীবীর মাধ্যমে ড্রাফট করানো উচিত।
- ডিড রাইটার (Deed Writer): সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের আশেপাশে অনেক দলিল লেখক থাকেন, তবে তাদের কাছে গেলে ভাষা অনেক সময় জটিল ও দুর্বোধ্য হতে পারে।
ভাড়ার চুক্তিপত্র সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্ন (FAQs)
১. নাম পরিবর্তন বা শর্ত পরিবর্তন কীভাবে করবেন?
মূল স্ট্যাম্প পেপারে কাটাকাটি করা যাবে না। কোনো শর্ত বদলাতে হলে উভয় পক্ষের সম্মতিতে একটি ‘Supplementary Agreement’ বা সম্পূরক চুক্তি করতে হবে অথবা পুরনোটি বাতিল করে নতুন চুক্তি করতে হবে।
২. রেন্ট এগ্রিমেন্ট নবায়ন কীভাবে করবেন?
১১ মাস শেষ হওয়ার পর যদি উভয় পক্ষ রাজি থাকে, তবে পুরনো চুক্তির পেছনে নবায়নের কথা লিখে সই করা যায় অথবা নতুন স্ট্যাম্পে নতুন চুক্তি করা যায় (এটাই সবচেয়ে নিরাপদ)।
৩. মালিক কি চুক্তি ছাড়া কাউকে উচ্ছেদ করতে পারে?
চুক্তি না থাকলেও, কেউ যদি নিয়মিত ভাড়া দিয়ে থাকেন, তবে তিনি ‘Statutory Tenant’ হিসেবে গণ্য হন। আইনত, উপযুক্ত কারণ ও নোটিশ ছাড়া কাউকে উচ্ছেদ করা যায় না। তবে চুক্তি না থাকলে আদালতে প্রমাণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
৪. পুলিশ ভেরিফিকেশন ফর্মে কি চুক্তির কপি লাগে?
হ্যাঁ, ডিএমপি (DMP) বা স্থানীয় থানায় ভাড়াটিয়া তথ্য ফরম জমা দেওয়ার সময় প্রায়ই ভাড়ার চুক্তির ফটোকপি চাওয়া হয়।
ভাড়াটিয়ার অধিকার (Tenant Rights)
- রশিদ (Rent Receipt) পাওয়ার অধিকার।
- বিনা নোটিশে উচ্ছেদ না হওয়ার অধিকার।
- গোপনীয়তা (মালিক যখন-তখন ঘরে ঢুকতে পারবেন না)।
বাড়িওয়ালার অধিকার (Landlord Rights)
- নির্ধারিত সময়ে ভাড়া পাওয়ার অধিকার।
- সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার।
- চুক্তি ভঙ্গের কারণে ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদের অধিকার।
উপসংহার
একটি সুচিন্তিত ভাড়ার চুক্তিপত্র মালিক এবং ভাড়াটিয়া—উভয়ের জন্যই শান্তির চাবিকাঠি। এটি শুধু আইনি দলিল নয়, এটি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও স্বচ্ছতার প্রতীক। তাই বাসা বা অফিস ভাড়া নেওয়ার আগে আবেগের বশবর্তী না হয়ে, ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে একটি লিখিত চুক্তি করে নিন। এতে আপনার কষ্টার্জিত অর্থ ও মানসিক শান্তি—দুটোই নিরাপদ থাকবে।



