দৈনন্দিন জীবনে বা ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে আমরা প্রতিনিয়ত নানা ধরণের চুক্তিতে আবদ্ধ হই। জমি কেনাবেচা থেকে শুরু করে চাকরির নিয়োগপত্র—সবই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু সমস্যা তখনই হয় যখন কোনো এক পক্ষ তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না বা চুক্তি ভঙ্গ করে। বাংলাদেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী, চুক্তি ভঙ্গ হলে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের প্রতিকার পাওয়ার সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে।
এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব চুক্তি ভঙ্গের প্রতিকারসমূহ কী কী, কীভাবে ক্ষতিপূরণ আদায় করা যায় এবং আদালতের মাধ্যমে কীভাবে ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব। আপনি যদি ব্যবসায়িক লেনদেন বা ব্যক্তিগত চুক্তির আইনি সুরক্ষা সম্পর্কে জানতে চান, তবে এই গাইডটি আপনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চুক্তি এবং চুক্তি ভঙ্গ কী?
১৮৭২ সালের চুক্তি আইন (The Contract Act, 1872) অনুযায়ী, আইনের দ্বারা বলবৎযোগ্য যেকোনো সম্মতিই হলো চুক্তি। অর্থাৎ, যখন দুই বা ততোধিক ব্যক্তি কোনো আইনগত সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে কোনো কিছু করা বা না করার জন্য সম্মত হয়, তখন তাকে চুক্তি বলে।
চুক্তি ভঙ্গ (Breach of Contract): চুক্তিতে আবদ্ধ কোনো পক্ষ যখন তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব বা প্রতিশ্রুতি পালন করতে ব্যর্থ হয়, অস্বীকার করে কিংবা এমন কোনো কাজ করে যার ফলে চুক্তি পালন অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন তাকে ‘চুক্তি ভঙ্গ’ বলা হয়।
চুক্তি ভঙ্গের প্রকারভেদ
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে চুক্তি ভঙ্গ প্রধানত দুই প্রকার হতে পারে:
১. প্রত্যাশিত চুক্তি ভঙ্গ (Anticipatory Breach): যখন চুক্তির সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই কোনো পক্ষ জানিয়ে দেয় যে সে চুক্তি পালন করবে না।
২. প্রকৃত চুক্তি ভঙ্গ (Actual Breach): যখন নির্দিষ্ট সময়ে বা চুক্তি পালনের সময় কোনো পক্ষ তার দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়।
উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ আইনের আশ্রয় নিতে পারে।
চুক্তি ভঙ্গের প্রতিকার সমূহ: এক নজরে
বাংলাদেশে চুক্তি ভঙ্গের প্রতিকারগুলো মূলত ১৮৭২ সালের চুক্তি আইন এবং ১৮৭৭ সালের সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন (Specific Relief Act, 1877) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আদালতের কাছে নিম্নোক্ত ৫টি প্রতিকারের যেকোনো একটি বা একাধিক প্রতিকার দাবি করতে পারে:
১. চুক্তি রদ (Rescission)
২. ক্ষতিপূরণ বা খেসারত (Damages)
৩. সুনির্দিষ্ট কার্য সম্পাদন (Specific Performance of Contract)
৪. নিষেধাজ্ঞা (Injunction)
৫. কার্যানুপাতিক মূল্য প্রদান (Quantum Meruit)
নিচে প্রতিটি প্রতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
প্রতিকার ১: চুক্তি রদ বা বাতিল (Rescission)
চুক্তি রদ হলো ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের প্রাথমিক প্রতিকার। যখন এক পক্ষ চুক্তি ভঙ্গ করে, তখন অপর পক্ষ চুক্তিটি খারিজ বা বাতিল করতে পারে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ তার নিজের দায়িত্ব পালন থেকে অব্যাহতি পায়।
আইনি বিধান:
চুক্তি আইনের ৩৯ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো পক্ষ তার প্রতিশ্রুতি পূর্ণাঙ্গভাবে পালন করতে অস্বীকৃতি জানায় বা নিজেকে অক্ষম করে ফেলে, তবে অপর পক্ষ চুক্তিটি রদ করতে পারে।
শর্তসমূহ:
- সমগ্র চুক্তি ভঙ্গের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য।
- চুক্তির অপরিহার্য বা মুখ্য শর্ত ভঙ্গ হলে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ চুক্তি বাতিল করতে পারে।
- তবে, গৌণ শর্ত ভঙ্গ হলে কেবল ক্ষতিপূরণ চাওয়া যায়, চুক্তি বাতিল করা যায় না।
মৌন সম্মতির প্রভাব: চুক্তি ভঙ্গের পরেও যদি ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ কোনোভাবে সম্মতি প্রকাশ করে বা মেনে নেয়, তবে পরবর্তীতে আর চুক্তি রদ করা যায় না।
উদাহরণ: ধরুন, “ক” একটি জুমআ মসজিদের খতিব হিসেবে নিয়োগ পেলেন। শর্ত ছিল তিনি প্রতি শুক্রবার খুতবা দেবেন। কিন্তু তিনি মসজিদ কমিটিকে না জানিয়ে মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার অনুপস্থিত থাকলেন। এটি চুক্তি ভঙ্গের শামিল এবং কমিটি চাইলে চুক্তি রদ করে তাকে বরখাস্ত করতে পারে।
কিন্তু, যদি “ক” মাসের তৃতীয় শুক্রবারে উপস্থিত হন এবং খুতবা দেন এবং কমিটি তা মেনে নেয় (বাধা না দেয়), তবে এটি “মৌন সম্মতি” হিসেবে গণ্য হবে। এক্ষেত্রে কমিটি আর পুরনো ভুলের জন্য চুক্তিটি বাতিল করতে পারবে না, তবে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে।
প্রতিকার ২: ক্ষতিপূরণ বা খেসারত (Damages)
চুক্তি আইনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে আর্থিক সুরক্ষা দেওয়া। চুক্তি ভঙ্গের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ যে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তা পূরণের জন্য অপর পক্ষের কাছ থেকে যে অর্থ আদায় করা হয়, তাকে ড্যামেজ (Damages) বা খেসারত বলে। এটি চুক্তি আইনের ৭৩ ও ৭৪ ধারা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।
ক্ষতিপূরণ সাধারণত চার ধরনের হতে পারে:
১. নামমাত্র ক্ষতিপূরণ (Nominal Damages)
যখন চুক্তি ভঙ্গের ফলে অপর পক্ষের প্রকৃত কোনো আর্থিক ক্ষতি হয় না, কিন্তু তার আইনি অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে—এমন পরিস্থিতিতে আদালত নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দেন। এটি মূলত বাদীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দেওয়া হয়।
২. সাধারণ বা প্রতুল পরিমাণ ক্ষতিপূরণ (Substantial/Ordinary Damages)
এটিই সবচেয়ে প্রচলিত ক্ষতিপূরণ। চুক্তি ভঙ্গ না করলে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ যে লাভ করত বা যে অবস্থায় থাকত, তাকে সেই অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, আদালত তা মঞ্জুর করেন। এটি “প্রকৃত ক্ষতির” সমপরিমাণ হয়।
৩. দৃষ্টান্তমূলক ক্ষতিপূরণ (Exemplary Damages)
যখন চুক্তি ভঙ্গের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের সম্মানে আঘাত লাগে বা মানসিক বিপর্যয় ঘটে, তখন আদালত শাস্তি হিসেবে এবং অন্যকে সতর্ক করার জন্য দৃষ্টান্তমূলক ক্ষতিপূরণ আরোপ করতে পারেন।
- উদাহরণ: বিয়ের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ (Breach of Promise of Marriage) বা ব্যাংকের ভুলবশত কোনো ব্যবসায়ীর চেক বাউন্স করানো (যা তার ব্যবসায়িক সুনামের ক্ষতি করে)।
৪. নির্ধারিত ও অনির্ধারিত ক্ষতিপূরণ (Liquidated vs Unliquidated Damages)
- Liquidated: চুক্তির সময়ই যদি উভয় পক্ষ ঠিক করে রাখে যে চুক্তি ভঙ্গ হলে কত টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
- Unliquidated: যদি আগে থেকে কোনো টাকার অঙ্ক ঠিক করা না থাকে এবং আদালত পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করেন।
প্রতিকার ৩: সুনির্দিষ্ট কার্য সম্পাদন (Specific Performance)
অনেক সময় আর্থিক ক্ষতিপূরণই যথেষ্ট নয়। এমন কিছু পরিস্থিতি থাকে যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ চায় যে, চুক্তিতে যা বলা ছিল, হুবহু সেই কাজটিই করা হোক। একে বলা হয় “সুনির্দিষ্ট কার্য সম্পাদন”।
এটি ১৮৭৭ সালের সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের (Specific Relief Act, 1877) ১২ ধারা অনুযায়ী আদালতের বিবেচনামূলক ক্ষমতা (Discretionary Power)। অর্থাৎ, এটি অধিকার হিসেবে দাবি করা যায় না, আদালত ন্যায়বিচারের স্বার্থে এটি মঞ্জুর করেন।
কখন আদালত সুনির্দিষ্ট কার্য সম্পাদনের নির্দেশ দেন?
আদালত সাধারণত নিম্নোক্ত চারটি ক্ষেত্রে এই আদেশ দেন:
১. ক্ষতির মানদণ্ড নেই: যখন চুক্তি ভঙ্গের ফলে যে ক্ষতি হয়েছে, তা পরিমাপ করার কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড নেই।
উদাহরণ: “ক” একটি দুর্লভ চিত্রকর্ম বা অ্যান্টিক বস্তু “খ”-এর কাছে বিক্রির চুক্তি করল। পরবর্তীতে “ক” তা বিক্রি করতে চাইল না। যেহেতু এটি দুর্লভ বস্তু এবং বাজারে সহজলভ্য নয়, তাই টাকার অঙ্কে এর ক্ষতি নিরূপণ অসম্ভব। আদালত এখানে ছবিটি বিক্রির আদেশ দিতে পারেন।
২. আর্থিক ক্ষতিপূরণ পর্যাপ্ত নয়: যখন টাকার বিনিময়ে ক্ষতি পোষানো সম্ভব নয়।
উদাহরণ: “ক” তার রাজশাহীর একটি বাড়ি “খ”-এর কাছে বিক্রির চুক্তি করল। “খ” ওই বাড়ি কেনার উদ্দেশ্যে তার গ্রামের জমিজমা বিক্রি করে টাকা জোগাড় করল। এখন “ক” বাড়ি বিক্রি করতে না চাইলে, শুধু টাকা ফেরত দিলে “খ”-এর আবাসন সমস্যার সমাধান হবে না। তাই আদালত বাড়িটি রেজিস্ট্রেশন করে দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন।
৩. স্মৃতিবিজড়িত সম্পত্তি: যদি সম্পত্তির সাথে ক্রেতার আবেগ বা স্মৃতি জড়িত থাকে।
উদাহরণ: পৈত্রিক ভিটা পুনরুদ্ধারের জন্য করা চুক্তি।
৪. আর্থিক দেউলিয়াত্ব: যদি বিবাদী (চুক্তি ভঙ্গকারী) দেউলিয়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সামর্থ্য না থাকে।
কখন সুনির্দিষ্ট কার্য সম্পাদন মঞ্জুর করা হয় না? (ধারা ২১)
- যেখানে আর্থিক ক্ষতিপূরণই যথেষ্ট।
- যেখানে চুক্তির পুঙ্খানুপুঙ্খ শর্তগুলো স্পষ্ট নয়।
- যে চুক্তি ব্যক্তিগত দক্ষতা বা যোগ্যতার ওপর নির্ভরশীল (যেমন: গান গাওয়া, ছবি আঁকা বা বিয়ের চুক্তি)।
- যে চুক্তি বাতিলযোগ্য (Voidable)।
- যে চুক্তির তদারকি করা আদালতের পক্ষে অসম্ভব (যেমন: কোনো বিল্ডিং নির্মাণের দীর্ঘমেয়াদী তদারকি)।
প্রতিকার ৪: নিষেধাজ্ঞা (Injunction)
নিষেধাজ্ঞা হলো আদালতের এমন একটি আদেশ যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট কোনো কাজ করতে বাধ্য করা হয় অথবা কোনো কাজ করা থেকে বিরত রাখা হয়। এটিও সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ১৮৭৭ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
চুক্তি ভঙ্গের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা মূলত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। নিষেধাজ্ঞা দুই ধরণের হতে পারে:
১. অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা (Temporary Injunction)
মামলা চলাকালীন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বা আদালতের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা জারি থাকে। এটি দেওয়ানি কার্যবিধি ১৯০৮ (Code of Civil Procedure, 1908) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। উদ্দেশ্য হলো—সম্পত্তি বা চুক্তির বিষয়বস্তু যে অবস্থায় আছে, বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেভাবেই রাখা (Status Quo)।
২. স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা (Perpetual Injunction)
মামলার শুনানি শেষে আদালত যখন চূড়ান্ত রায়ের মাধ্যমে বিবাদীকে চিরস্থায়ীভাবে কোনো কাজ করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। এটি সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৫৩ ও ৫৪ ধারায় বর্ণিত।
কাজের প্রকৃতি অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞা আবার দুই প্রকার:
- নিষেধমূলক (Prohibitory): কোনো কাজ করতে বারণ করা। যেমন: “ক” যেন চুক্তিকৃত জমিটি অন্য কোথাও বিক্রি না করে।
- আদেশমূলক (Mandatory): কোনো কাজ করতে বাধ্য করা। যেমন: অবৈধভাবে নির্মিত দেয়াল ভেঙে ফেলার নির্দেশ।
বাস্তব উদাহরণ (ওয়ার্নার বনাম নেলসন মামলা):
একজন গায়িকা একটি নির্দিষ্ট থিয়েটারে গান গাওয়ার চুক্তি করেছিলেন এবং শর্ত ছিল তিনি ওই সময়ে অন্য কোথাও গান গাইবেন না। তিনি চুক্তি ভঙ্গ করে অন্য জায়গায় গাইতে চাইলে, আদালত তাকে গান গাইতে বাধ্য করতে পারেনি (কারণ এটি ব্যক্তিগত দক্ষতা), কিন্তু অন্য কোথাও গান গাওয়া থেকে বিরত থাকার জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন।
প্রতিকার ৫: কার্যানুপাতিক মূল্য প্রদান (Quantum Meruit)
ল্যাটিন শব্দ ‘Quantum Meruit’-এর অর্থ হলো “যতটুকু কাজ, ততটুকু মূল্য” (As much as earned)।
যখন একটি চুক্তি সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই কোনো কারণে বাতিল হয়ে যায় বা ভঙ্গ হয়, কিন্তু ইতিমধ্যে এক পক্ষ চুক্তির কিছু অংশ পালন করেছে, তখন সেই আংশিক কাজের জন্য পারিশ্রমিক বা মূল্য দাবি করার অধিকারকে কার্যানুপাতিক মূল্য প্রদান নীতি বলা হয়।
কখন এই নীতি প্রযোজ্য হয়?
১. যখন চুক্তিটি বাতিল বা অকার্যকর (Void) হয়ে যায়।
২. যখন এক পক্ষ কাজ শুরু করার পর অন্য পক্ষ তাকে বাধা দেয় বা চুক্তি ভঙ্গ করে।
৩. যখন কোনো ব্যক্তি অবৈতনিক নয় (Non-gratuitous) এমন কোনো সেবা প্রদান করেন এবং অন্য ব্যক্তি সেই সেবার সুবিধা ভোগ করেন (চুক্তি আইনের ৭০ ধারা)।
উদাহরণ: একজন ঠিকাদারকে ১০ তলা বিল্ডিং তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হলো। ৫ তলা তৈরির পর জমির মালিক বেআইনিভাবে চুক্তি বাতিল করলেন। এমতাবস্থায়, ঠিকাদার পুরো ১০ তলার টাকা দাবি করতে পারবেন না ঠিকই, কিন্তু যে ৫ তলা তিনি তৈরি করেছেন, তার মূল্য বা ক্ষতিপূরণ তিনি Quantum Meruit নীতিতে দাবি করতে পারবেন।
মামলা করার সময়সীমা (Limitation)
আইন কখনো অলস ব্যক্তিকে সাহায্য করে না। চুক্তি ভঙ্গের প্রতিকার পেতে হলে আপনাকে অবশ্যই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মামলা করতে হবে। তামাদি আইন ১৯০৮ (The Limitation Act, 1908) অনুযায়ী:
- চুক্তি ভঙ্গের ক্ষতিপূরণ: চুক্তি ভঙ্গের তারিখ থেকে ৩ বছরের মধ্যে মামলা করতে হবে।
- সুনির্দিষ্ট কার্য সম্পাদন: চুক্তি পালনের নির্ধারিত তারিখ পার হওয়ার বা অস্বীকার করার তারিখ থেকে ১ বছরের মধ্যে মামলা করতে হবে (ধারা ১১৩)।
তাই চুক্তি ভঙ্গ হলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত আইনি পরামর্শ নেওয়া উচিত।
উপসংহার
চুক্তি ভঙ্গের প্রতিকার মূলত নির্ভর করে চুক্তির ধরণ, ক্ষতির পরিমাণ এবং পরিস্থিতির ওপর। ছোটখাটো ভুলের জন্য সাধারণত ক্ষতিপূরণ বা ড্যামেজই যথেষ্ট। কিন্তু জমি-জমা, বিরল বস্তু বা বড় ব্যবসায়িক স্বার্থের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কার্য সম্পাদন বা নিষেধাজ্ঞার মতো কঠোর প্রতিকারগুলো বেশি কার্যকর।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, চুক্তি আইন এবং সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে শক্তিশালী সুরক্ষা প্রদান করে। তবে মনে রাখতে হবে, যেকোনো মৌখিক চুক্তির চেয়ে লিখিত এবং রেজিস্ট্রিকৃত চুক্তি আদালতে প্রমাণ করা অনেক সহজ। তাই যেকোনো লেনদেনে স্বচ্ছতা ও লিখিত দলিল থাকা বাঞ্ছনীয়।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. মৌখিক চুক্তি ভঙ্গ করলে কি মামলা করা যায়?
হ্যাঁ, যায়। ১৮৭২ সালের চুক্তি আইন অনুযায়ী মৌখিক চুক্তিও একটি বৈধ চুক্তি। তবে আদালতে মৌখিক চুক্তি প্রমাণ করা কঠিন। এজন্য সাক্ষী এবং পারিপার্শ্বিক প্রমাণের প্রয়োজন হয়।
২. চুক্তি ভঙ্গের জন্য কি জেল বা জরিমানা হতে পারে?
চুক্তি ভঙ্গ মূলত একটি দেওয়ানি (Civil) অপরাধ। তাই এর জন্য সাধারণত জেল হয় না, বরং আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা চুক্তি পালনের আদেশ দেওয়া হয়। তবে, যদি চুক্তির মাধ্যমে প্রতারণা (Cheating) বা বিশ্বাসভঙ্গ (Breach of Trust) করা হয়, তবে দণ্ডবিধির (Penal Code) অধীনে ফৌজদারি মামলা করা যেতে পারে, যাতে জেলের বিধান রয়েছে।
৩. পুলিশ কি চুক্তি ভঙ্গের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে?
সাধারণত না। এটি দেওয়ানি আদালতের এখতিয়ারভুক্ত। তবে প্রতারণা বা জালিয়াতির উপাদান থাকলে পুলিশ মামলা নিতে পারে।
৪. ‘ফোর্স মেজোয়র’ (Force Majeure) বা দৈবদুর্বিপাক কী?
যদি ভূমিকম্প, যুদ্ধ বা মহামারীর (যেমন করোনা) মতো কোনো কারণে চুক্তি পালন অসম্ভব হয়ে পড়ে, তবে তাকে ফোর্স মেজোয়র বলা হয়। এক্ষেত্রে চুক্তি ভঙ্গ হয়েছে বলে ধরা হয় না এবং উভয় পক্ষ দায়মুক্তি পেতে পারে (চুক্তি আইনের ৫৬ ধারা)।



