বাংলাদেশ বিচার বিভাগ সচিবালয় না হয়ে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়’ নামকরণ কেন?

বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। দীর্ঘ কয়েক দশকের আইনি লড়াই, সাংবিধানিক বিতর্ক এবং মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে অবশেষে একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয়েছে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়’ (Supreme Court Secretariat)

সাধারণ মানুষের মনে বা বিচার বিভাগের অনেকের আবেগের জায়গা থেকে প্রশ্ন উঠতে পারে—এর নাম ‘বিচার বিভাগ সচিবালয়’ হলে কি বেশি ভালো হতো না? নামটিতে তো পুরো বিচার অঙ্গনের একাত্ববোধ ফুটে উঠত। কিন্তু আইনের গভীর বিশ্লেষণ, প্রশাসনিক কৌশল এবং বিচার বিভাগের নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রশ্নে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়’ নামটিই কেন অপরিহার্য, তা জানা প্রতিটি সচেতন নাগরিকের জন্য জরুরি।

এই আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করব কেন এই নামকরণ, এর পেছনের সাংবিধানিক যুক্তি কী, এবং সাধারণ মানুষের বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন কী প্রভাব ফেলবে।

Separate Supreme Court secretariat

বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দীর্ঘ সংগ্রাম ও প্রেক্ষাপট

বিচার বিভাগের জন্য একটি পৃথক সচিবালয়ের প্রয়োজনীয়তা একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ বঞ্চনা ও নিয়ন্ত্রণের ইতিহাস।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সুস্পষ্ট ঘোষণা ছিল। সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্র নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথকীকরণ নিশ্চিত করবে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের (সরকারের) নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে অধস্তন বা নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ, বদলি এবং পদোন্নতির ক্ষমতা আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে ন্যস্ত ছিল।

মাসদার হোসেন মামলা: স্বাধীনতার ভিত্তিপ্রস্তর

১৯৯৯ সালে ঐতিহাসিক ‘মাসদার হোসেন বনাম বাংলাদেশ’ মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করার জন্য ১২ দফা নির্দেশনা প্রদান করেন। এই রায়ের অন্যতম প্রধান নির্দেশনা ছিল—বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণমুক্ত একটি ‘পৃথক সচিবালয়’ প্রতিষ্ঠা করা।

দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও, নানা রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সেই সচিবালয় আলোর মুখ দেখেনি। বর্তমান সময়ে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের অংশ হিসেবে সেই দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হতে যাচ্ছে।

‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়’ নামকরণের নেপথ্য কারণ ও সাংবিধানিক যুক্তি

নামকরণ কেবল একটি সাইনবোর্ড পরিবর্তনের বিষয় নয়; এটি ক্ষমতার উৎস ও প্রয়োগের নির্দেশক। কেন ‘বিচার বিভাগ সচিবালয়’ না বলে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়’ বলা হচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে শক্ত সাংবিধানিক ভিত্তি।

ক. সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ

বাংলাদেশের সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, হাইকোর্ট বিভাগের অধস্তন সকল আদালত ও ট্রাইব্যুনালের ওপর হাইকোর্টের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা রয়েছে। এতদিন আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এই কাজগুলো হতো বলে বিচার বিভাগের ওপর এক ধরণের ‘দ্বৈত শাসন’ বজায় ছিল।

সহজ কথায়: বিচারক একজন, কিন্তু তার বস দুইজন। রায়ের ক্ষেত্রে তিনি সুপ্রিম কোর্টের অধীন, কিন্তু তার বদলি বা ছুটির জন্য তাকে মন্ত্রণালয়ের আমলার দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো।

এখন যেহেতু এই প্রশাসনিক ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্ট সরাসরি প্রয়োগ করবে, তাই এই কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য যে সচিবালয়টি কাজ করবে, তা গঠনগতভাবে সুপ্রিম কোর্টেরই অংশ হওয়া বাঞ্ছনীয়। ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়’ নামটি এই মালিকানা ও কর্তৃত্বকে স্পষ্ট করে।

খ. প্রশাসনিক ধোঁয়াশা দূরীকরণ

যদি এর নাম ‘বিচার বিভাগ সচিবালয়’ রাখা হতো, তবে প্রশাসনিকভাবে একটি ধোঁয়াশা তৈরির সুযোগ থাকত। ভবিষ্যতে প্রশ্ন উঠতে পারত:

  • এটি কি আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে কোনো বিশেষ উইং?
  • নাকি এটি নির্বাচন কমিশনের মতো আলাদা কোনো সাংবিধানিক বডি?
  • এর জবাবদিহিতা কার কাছে? সংসদের কাছে নাকি প্রধান বিচারপতির কাছে?

‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়’ নামটি এই সমস্ত বিভ্রান্তি দূর করে নিশ্চিত করে যে, এই সচিবালয়টি সরাসরি মাননীয় প্রধান বিচারপতির অধীন এবং সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের দপ্তরের একটি বর্ধিত ও শক্তিশালী প্রশাসনিক রূপ।

‘বিচার বিভাগ সচিবালয়’ ও ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়’-এর মধ্যে পার্থক্য

যদিও উভয় নামের মূল উদ্দেশ্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, তবু এদের ধারণা ও প্রায়োগিক অর্থের মধ্যে সূক্ষ্ম কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।

পার্থক্যের বিষয় বিচার বিভাগ সচিবালয় (Judicial Secretariat) সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (Supreme Court Secretariat)
ধারণাগত অর্থ এটি একটি ব্যাপক ধারণা, যা বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কাজের জন্য স্বতন্ত্র একটি দপ্তরকে বোঝায়। এটি সুনির্দিষ্টভাবে সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ।
নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব ভবিষ্যতে নির্বাহী বিভাগ বা মন্ত্রণালয়ের পরোক্ষ প্রভাব বিস্তারের বা প্যারালাল অথরিটি তৈরির সুযোগ থাকতে পারে। এর নিয়ন্ত্রণ শতভাগ সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল এবং প্রধান বিচারপতির হাতে থাকে। বাইরের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।
সাংবিধানিক অবস্থান সংবিধানের কাঠামোতে এর অবস্থান কিছুটা অস্পষ্ট হতে পারে। সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদের সাথে সরাসরি সঙ্গতিপূর্ণ।
চেইন অব কমান্ড অধস্তন আদালতগুলো এটিকে সুপ্রিম কোর্টের প্রতিদ্বন্দ্বী বা বিকল্প প্রশাসনিক কেন্দ্র ভাবতে পারে। চেইন অব কমান্ড বা হাইকোর্টের তত্ত্বাবধান অক্ষুণ্ন থাকে।

আবেগের বনাম বাস্তবতার লড়াই: কোন নামটি অধিক যৌক্তিক?

অধস্তন আদালতের বিচারকদের অনেকের আবেগের জায়গা থেকে ‘বিচার বিভাগ সচিবালয়’ নামটি বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে। কারণ, তারা মনে করেন এতে উচ্চ আদালত ও নিম্ন আদালতের মধ্যে বিভাজন কমে আসবে এবং তারা নিজেদের সরাসরি ‘বিচার বিভাগের অংশ’ হিসেবে ভাববেন, সুপ্রিম কোর্টের ‘অধীনস্থ’ হিসেবে নয়।

তবে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আবেগ অপেক্ষা আইনি সুরক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আইনি সুরক্ষা (Legal Safeguard)

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মানেই হলো নির্বাহী বিভাগ (মন্ত্রণালয়) থেকে আলাদা হওয়া। ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়’ নাম হলে নির্বাহী বিভাগ চাইলেও ভবিষ্যতে এই সচিবালয়ের ওপর কর্তৃত্ব দাবি করতে পারবে না, কারণ এটি সুপ্রিম কোর্টের ‘নিজস্ব অঙ্গ’ (Organ)। কিন্তু ‘বিচার বিভাগ সচিবালয়’ হলে ভবিষ্যতে কোনো সরকার আইন করে এর নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব বা অন্য কোনো আমলার হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

চেইন অব কমান্ড রক্ষা (Preserving Chain of Command)

বিচার বিভাগে চেইন অব কমান্ড বা হাইকোর্টের তত্ত্বাবধান অত্যন্ত জরুরি। একটি পৃথক ‘বিচার বিভাগ সচিবালয়’ হলে ভবিষ্যতে সেটি সুপ্রিম কোর্টের সমান্তরাল বা ‘প্যারালাল’ কোনো শক্তিকেন্দ্র হয়ে ওঠার ঝুঁকি থাকত। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা তখন বিচারকদের ওপর ছড়ি ঘোরানোর চেষ্টা করতে পারতেন, যা বিচার প্রশাসনের শৃঙ্খলার জন্য ক্ষতিকর হতে পারত। সুপ্রিম কোর্টের অধীনে রাখলে সেই ঝুঁকি থাকে না।

দ্বৈত শাসনের অবসান: বিচারকদের ওপর কী প্রভাব পড়বে?

এতদিন বাংলাদেশে অধস্তন আদালতের বিচারকদের ওপর এক অদ্ভুত ‘দ্বৈত শাসন’ (Dual Rule) চালু ছিল। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের কারণে বিচারকদের পোস্টিং, প্রমোশন ও ছুটির বিষয়টি রাষ্ট্রপতির হাতে (প্রকৃতপক্ষে আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে) ন্যস্ত ছিল।

নতুন ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়’ প্রতিষ্ঠার ফলে:

১. স্বাধীনভাবে কাজ করা: বিচারকদের আর বদলি বা পদোন্নতির জন্য মন্ত্রণালয়ের বারান্দায় ঘুরতে হবে না। তারা নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে বিচার কাজ পরিচালনা করতে পারবেন।

২. দ্রুত নিয়োগ ও পদোন্নতি: মন্ত্রণালয়ের লাল ফিতার দৌরাত্ম্য না থাকায় শূন্য পদে দ্রুত বিচারক নিয়োগ এবং যোগ্যদের পদোন্নতি নিশ্চিত হবে।

৩. শৃঙ্খলা রক্ষা: কোনো বিচারক দুর্নীতি বা অসদাচরণ করলে সুপ্রিম কোর্ট সরাসরি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে, যা আগে দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আটকে থাকত।

সাধারণ মানুষের কী লাভ? (Public Benefit)

অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, সচিবালয়ের নাম বা কাঠামো বদলে সাধারণ মানুষের কী লাভ? উত্তরটি অত্যন্ত সরাসরি:

  • মামলা জট নিরসন: বর্তমানে দেশে প্রায় ৪০ লাখের বেশি মামলা ঝুলে আছে। এর অন্যতম কারণ বিচারক সংকট এবং প্রশাসনিক ধীরগতি। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় স্বাধীনভাবে কাজ করলে দ্রুত বিচারক নিয়োগ ও লজিস্টিক সাপোর্ট নিশ্চিত করা যাবে, ফলে মামলা জট কমবে।
  • দুর্নীতিমুক্ত বিচার: বিচারকরা যখন জানবেন তাদের পদোন্নতি মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক নেতাদের হাতে নয়, বরং তাদের কাজের মানের ওপর নির্ভর করে সুপ্রিম কোর্ট দেবে, তখন তারা আরও সৎ ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করবেন।
  • ন্যায়বিচার প্রাপ্তি: বিচার বিভাগ স্বাধীন হলে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রায় পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। সাধারণ মানুষ তখন আদালতে গিয়ে সঠিক বিচার পাওয়ার আশা করতে পারেন।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, যদিও ‘বিচার বিভাগ সচিবালয়’ নামটি শ্রুতিমধুর এবং সর্বজনীন মনে হয়, কিন্তু মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়’ নামটিই অধিকতর বাস্তবসম্মত ও আইনিভাবে শক্তিশালী।

এটি নিশ্চিত করে যে, বিচার বিভাগের প্রশাসনিক নাটাই এখন থেকে আর মন্ত্রণালয়ের হাতে নয়, বরং সরাসরি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের হাতেই থাকবে, যা সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদের চেতনার সাথে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ।

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা বর্তমান সরকার, মাননীয় প্রধান বিচারপতি এবং মাননীয় অ্যাটর্নি জেনারেলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার এক ঐতিহাসিক সাফল্য। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক ভবন বা দপ্তর নয়; এটি বাংলাদেশের মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার একটি প্রতীকী দুর্গ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top