বাংলাদেশে বায়না দলিলের কোনো নির্দিষ্ট আইনগত মেয়াদ নেই — মেয়াদ সাধারণত দলিলে যা লেখা থাকে, সেটাই প্রযোজ্য। তবে দলের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আইনগতভাবে মামলা করার সময়সীমা (Limitation) আছে। নিচে সবকিছু সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
প্রথমেই — বায়না দলিল কী এবং কেন এটি করা হয়?
বায়না দলিল (বা বায়নানামা) হলো একজন ক্রেতা ও একজন বিক্রেতার মধ্যে করা একটি প্রাথমিক চুক্তি। এতে ক্রেতা ভবিষ্যতে সম্পত্তি কেনবার অঙ্গীকার করে এবং বিক্রেতা কিছু শর্তে বিক্রয় নিশ্চিত করেন। সাধারণত ক্রেতা অগ্রিম টাকা (বায়না টাকা) দিয়ে এই চুক্তি করে।
বায়না দলিলের প্রধান উদ্দেশ্য
- চাহিদা ও প্রতিশ্রুতি লিখিতভাবে নিশ্চিত করা।
- দুই পক্ষের মধ্যে বিশ্বাস গঠন করা এবং ভবিষ্যতে বিরোধ কমানো।
- চূড়ান্ত বিক্রয়ের আগে কোনো পক্ষ দ্রুত থেকে পিছিয়ে গেলে আইনি প্রমাণ থাকা।
বায়না দলিলের মেয়াদ (Duration) নির্ধারণ কিভাবে হয়?
বাংলাদেশে বায়না দলিলের (Advance Sale Agreement) বা বায়নানামা-র কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ আইন দ্বারা স্থির করা নেই, তবে এর মেয়াদ সাধারণত দলিলেই নির্ধারিত থাকে — অর্থাৎ, বিক্রেতা ও ক্রেতা চুক্তিতে যে সময়সীমা উল্লেখ করবেন, সেটাই কার্যকর হবে— যেমন ৩ মাস, ৬ মাস বা ১ বছর ইত্যাদি।
আরো পড়ুনঃ জমির দলিল কি?
মেয়াদ শেষ হলে কী হবে — ব্যবহারিক ও আইনি দিক
বায়না দলিলের মেয়াদ শেষ হলে সাধারণত তিনটা সম্ভাব্য পথ থাকে:
- পারস্পরিক সমঝোতা: ক্রেতা ও বিক্রেতা যদি চান, সমঝোতা করে নতুন সময় ঠিক করে দলিল বাড়ানো যায় (Extension Agreement)।
- চুক্তি বাতিল ও টাকা বাজেয়াপ্ত: যদি ক্রেতা নির্ধারিত সময়ে টাকা দিতে ব্যর্থ হন এবং দলিলে এমন ধারা থাকে, তবে বিক্রেতা বায়না টাকা বাজেয়াপ্ত করতে পারেন।
- আইনি ব্যবস্থা: বিক্রেতা চুক্তি ভঙ্গ করলে ক্রেতা আদালতে গিয়ে Specific Performance বা ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন।
তামাদি আইন (Limitation Act) কিভাবে প্রযোজ্য?
চুক্তি-সম্পর্কিত বিরোধে মামলার সময়সীমা নির্ধারণে Limitation Act, 1908 গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত এমন কেসে — যেখানে চুক্তি (বায়না দলিল) অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করা হয়নি — মামলার সময়সীমা হচ্ছে চুক্তি শেষ হওয়ার তারিখ থেকে ৩ বছর। অর্থাৎ মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ৩ বছরের মধ্যে মামলা করতে হবে।
কী কী বিষয় বায়না দলিলে অবশ্যই লিখতে হবে?
একটি পরিষ্কার বায়না দলিল ভবিষ্যতে ঝামেলা কমায়। নীচেরগুলো অন্তর্ভুক্ত করা উচিত—
- বায়না (অগ্রিম) টাকার পরিমাণ ও প্রদান পদ্ধতি।
- বায়না দলিলের মেয়াদ — স্পষ্ট তারিখ বা দিনের সংখ্যা।
- মূল বিক্রয় দলিল সম্পাদনের সময় ও স্থান সম্পর্কিত শর্ত।
- চুক্তি ভঙ্গের পরিণতি (টাকা ফেরত, বাজেয়াপ্ত, ক্ষতিপূরণ ইত্যাদি)।
- দলিলভুক্ত ব্যক্তিদের নাম, ঠিকানা ও সাক্ষীর তথ্য।
- প্রয়োজন হলে দলিল রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত শর্ত।
উদাহরণধর্মী ধারা (Clause):
বায়না দলিল রেজিস্ট্রি করা উচিত কি না?
বায়না দলিল নির্বচনাত্মকভাবে রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক নয় — তবে বড় মূল্য বা ঝুঁকির লেনদেন হলে রেজিস্ট্রি করালে তা শক্ত প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। রেজিস্ট্রেশন করলে ভবিষ্যতে পক্ষদের জন্য প্রমাণ সংগ্রহ সহজ হয় এবং আইনি অবস্থান মজবুত থাকে।
চেকলিস্ট — বায়না দলিল লেখার সময় মনে রাখার জিনিসগুলো
| # | আয়টেম | কেন জরুরি? |
|---|---|---|
| 1 | মেয়াদ স্পষ্টভাবে লেখা আছে? | বিচার্যতা বোঝাতে সহায়তা করে |
| 2 | বায়না টাকার পরিমাণ ও চালান রেকর্ড আছে? | অর্থনৈতিক বিষয় নির্ধারণ করে |
| 3 | চুক্তি ভঙ্গ হলে কি হবে তা লেখা আছে? | যদি বিরোধ হয়, সিদ্ধান্ত সহজ হয় |
| 4 | সাক্ষী ও পরিচয়পত্র সংযুক্ত আছে? | পরে প্রমাণের কাজে লাগে |
| 5 | রেজিস্ট্রেশন প্রয়োজন হলে কীভাবে করা হবে? | আইনি শক্তি বৃদ্ধি পায় |
নামুনা — সরল বায়না ধারা (Template)
নিচে একটি সরল ও ব্যবহারযোগ্য নমুনা ধারা দিলাম — এটি তুমি নিজের পরিস্থিতি অনুযায়ী সামান্য পরিবর্তন করে ব্যবহার করতে পারো:
সাধারণ ভুলগুলো যা এড়ানো উচিত
- দলিলে মেয়াদ স্পষ্টভাবে না লেখা — অস্পষ্টতা ভবিষ্যতে সমস্যা বাড়ায়।
- মৌখিক চুক্তির ওপর পুরো নির্ভর — লিখিত দলিল ছাড়া প্রমাণ দুর্বল থাকে।
- দলিলের কপি না রাখা — কাগজপত্র সংরক্ষণ জরুরি।
- রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত বিষয় এড়িয়ে যাওয়া — বড় লেনদেনে রেজিস্ট্রি করাও বিবেচ্য।
প্রশ্নোত্তর (FAQ)
সাধারণত বায়না দলিলে কতদিনের মেয়াদ লেখা হয়?
উত্তর: সাধারণত ৩ মাস, ৬ মাস বা ১ বছর এরকম স্বাভাবিক সময়সীমা দেখা যায়; তবে এটি সম্পূর্ণ দলিলের পারস্পরিক চাহিদা ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।
মেয়াদ শেষ হলে কীভাবে সময় বাড়াবো?
উত্তর: বিক্রেতা ও ক্রেতা যদি রাজি হন, একটি সংক্ষিপ্ত Extension Agreement বা লেখিত সম্মতি করে নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে এবং সেটি দুই পক্ষ স্বাক্ষর করবেন।
যদি বিক্রেতা চুক্তি ভঙ্গ করে — আমি কী করবো?
উত্তর: প্রথমে লিখিত নোটিশ পাঠান; যদি কাজ না হলে আদালতে Specific Performance বা ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারেন — তবে সময়সীমা মনে রাখবেন (সাধারণত ৩ বছর)।
উপসংহার
সংক্ষেপে বললে — বাংলাদেশে বায়না দলিলের মেয়াদ কোনো একক আইনে নির্দিষ্ট নয়; দলিলেই যা লেখা থাকবে, সেটাই মেয়াদ। তবে চুক্তি ভঙ্গের পর মামলা করার জন্য তামাদি আইনের আওতায় সাধারণত ৩ বছরের সময়সীমা প্রযোজ্য।
বড় এই ধরনের লেনদেনে একজন আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করে স্পষ্ট, শক্তিশালী বায়না দলিল তৈরি করাই বুদ্ধিমানের কাজ।



