বাংলাদেশে জমি বা ফ্ল্যাট কেনা-বেচার ক্ষেত্রে দলিল রেজিস্ট্রেশন একটি বাধ্যতামূলক আইনগত প্রক্রিয়া। নিবন্ধন আইন, ১৯০৮ এর ধারা ৫২ক, ২২ক(১), ২২ক(২) ও ২২ক(৩) অনুযায়ী, দলিল রেজিস্ট্রেশনের জন্য নির্দিষ্ট কিছু কাগজপত্র আবশ্যক। এই আর্টিকেলে বিস্তারিতভাবে জানানো হলো— কোন কোন ডকুমেন্ট প্রয়োজন, কোথা থেকে পাবেন, দলিল রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া, খরচ এবং সময়সীমা।
জমি রেজিস্ট্রেশন করতে যে ডকুমেন্টগুলো প্রয়োজন
| ডকুমেন্টের নাম | যেখান থেকে সংগ্রহ করবেন |
| জমির খতিয়ান (সিএস/এসএ/আরএস/বিএস/বিআরএস) | www.land.gov.bd অথবা ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্র / জেলা প্রশাসকের রেকর্ড রুম |
| ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধের রশিদ (দাখিলা) | ইউনিয়ন ভূমি অফিস (তহশিল অফিস) / সাব-রেজিস্ট্রার অফিস |
| ক্রেতা ও বিক্রেতার জাতীয় পরিচয়পত্র/জন্ম নিবন্ধন/পাসপোর্ট | নির্বাচন কমিশন / ইউনিয়ন পরিষদ / পাসপোর্ট অধিদপ্তর |
| ওয়ারিশ সনদ (যদি উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি হয়) | স্থানীয় পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ অফিস |
| ক্রেতা ও বিক্রেতার সদ্যতোলা পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি | ফটোস্টুডিও |
| বায়া দলিলের মূল কপি বা সার্টিফাইড কপি | সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রার অফিস বা জেলা রেজিস্ট্রারের রেকর্ড রুম |
| ক্রেতা-বিক্রেতার E-TIN (যদি সম্পত্তির মূল্য ১ লক্ষ টাকার বেশি হয়) | জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (www.nbr.gov.bd) |
দলিল লেখার নিয়ম ও শর্তাবলি
সাধারণ নাগরিক নিজে দলিল লিখতে পারবেন না। দলিল লেখক হতে হলে নির্ধারিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সাব-রেজিস্ট্রারের কাছ থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। বিনা রেজিস্ট্রেশন দলিলের কোনো আইনগত মূল্য নেই।
রেজিস্ট্রির জন্য দলিল গ্রহণ বনাম দলিল রেজিস্ট্রি
রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল জমা দেওয়া মানেই রেজিস্ট্রি সম্পন্ন নয়। অফিসভেদে রেজিস্ট্রি সম্পূর্ণ হতে ২-৩ বছরও লাগতে পারে। দলিল নকল করে সাব-রেজিস্ট্রার কর্তৃক স্বাক্ষর শেষে বালাম বহিতে অন্তর্ভুক্ত হলে সেটিই দলিল রেজিস্ট্রি হিসেবে গণ্য হয়।
দলিল রেজিস্ট্রি না করলে কী সমস্যা হবে?
২০০৫ সালের ১ জুলাই থেকে যেকোনো হস্তান্তরযোগ্য জমির দলিল রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক। রেজিস্ট্রেশন ছাড়া দলিলের মাধ্যমে কোনো দাবি করা যায় না। সাব-কবলা দলিল, হেবা দলিল, দানপত্র, বায়না দলিল, বন্ধকি দলিল, বণ্টননামা প্রভৃতি অবশ্যই রেজিস্ট্রি করতে হয়।
দলিল রেজিস্ট্রেশনের সরকারি ফি
| সম্পত্তির মূল্য | রেজিস্ট্রেশন ফি |
|---|---|
| ৫ লাখ টাকার নিচে | ৳ ৫০০ |
| ৫ লাখ – ৫০ লাখ টাকার মধ্যে | ৳ ১,০০০ |
| ৫০ লাখ টাকার বেশি | ৳ ২,০০০ |
| বন্ধকি অর্থ ৫ লাখ টাকার নিচে | অর্থের ১% (ন্যূনতম ২০০, সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা) |
| বন্ধকি অর্থ ৫ লাখ – ২০ লাখ টাকার মধ্যে | অর্থের ০.২৫% (ন্যূনতম ১,৫০০, সর্বোচ্চ ২,০০০ টাকা) |
দলিল ফেরত নেওয়ার সময়সীমা
রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হওয়ার পর ৫২ ধারার রশিদ জমা দিয়ে মূল দলিল সংগ্রহ করতে হয়। নোটিশ পাওয়ার এক মাসের মধ্যে দলিল না নিলে প্রতি মাসে ৫ টাকা হারে জরিমানা দিতে হয় (সর্বোচ্চ ১০০ টাকা)। রেজিস্ট্রি অফিসে কোনো দলিল ২ বছর দাবিবিহীন থাকলে নিবন্ধন আইন, ১৯০৮ এর ধারা ৮৫ অনুযায়ী সেটি ধ্বংস করে ফেলা যায়। তাই সময়মতো দলিল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা জরুরি।
উপসংহার
দলিল রেজিস্ট্রেশন শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটি আপনার সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। তাই আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব কাগজপত্রসহ রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।



