ভূমির মালিকানা পরিবর্তন বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের জন্য ‘নামজারি’ বা ‘মিউটেশন’ শব্দটি ছিল এক চরম ভোগান্তি ও দুর্নীতির সমার্থক। একটি জমির দলিল রেজিস্ট্রি করার পরও সরকারি রেকর্ডে নতুন মালিকের নাম লেখাতে মাসের পর মাস ভূমি অফিসে ঘুরতে হতো, খরচ করতে হতো অতিরিক্ত অর্থ, এবং মুখোমুখি হতে হতো সীমাহীন হয়রানির। এই দীর্ঘসূত্রিতা কেবল সাধারণ মানুষের জীবনকেই দুর্বিষহ করে তোলেনি, বরং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকেও বাধাগ্রস্ত করেছে। এই ভোগান্তির অবসান ঘটাতে এবং ভূমি সেবাকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত ও গতিশীল করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে—তা হলো স্বয়ংক্রিয় নামজারি (Auto-Mutation) পদ্ধতি।
এই নতুন স্বয়ংক্রিয় নামজারি প্রক্রিয়ায় ভূমি মালিকদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটতে যাচ্ছে। ভূমি মন্ত্রণালয় স্পষ্ট ঘোষণা করেছে: বাতিল করা হচ্ছে বর্তমান নামজারি পদ্ধতি, এবং এখন থেকে আলাদা করে নামজারির আবেদন করতে হবে না। বরং, দলিল রেজিস্ট্রির সঙ্গেই সম্পন্ন হবে নামজারি।
বর্তমান ভূমি নামজারি পদ্ধতির সংকট ও দুর্নীতির চিত্র
স্বয়ংক্রিয় নামজারির গুরুত্ব বুঝতে হলে, আমাদের প্রথমে প্রচলিত নামজারি পদ্ধতির সমস্যাগুলো পর্যালোচনা করতে হবে। নামজারি মূলত একটি আইনি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে জমির মালিকানা পুরোনো মালিকের নাম থেকে নতুন মালিকের নামে সরকারিভাবে রেকর্ডভুক্ত হয় এবং নতুন হোল্ডিং বা জোতের সৃষ্টি হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়াটি বাস্তবে ছিল দুর্নীতি ও হয়রানির আখড়া।
ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা, হয়রানি ও অতিরিক্ত খরচ
প্রচলিত ব্যবস্থায়, একটি দলিল রেজিস্ট্রি হওয়ার পরও নতুন মালিককে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড অফিসে গিয়ে নামজারির জন্য আবেদন করতে হতো। যদিও সরকার ই-নামজারি (অনলাইন নামজারি) চালু করে প্রক্রিয়াটিকে কিছুটা সহজ করেছে, তবুও এই পদ্ধতিটিও ছিল আবেদন-নির্ভর এবং এতে একাধিক ধাপ অতিক্রম করতে হতো।
- সময়ক্ষেপণ: বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, মহানগরে ৬০ কর্মদিবস এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ৪৫ কর্মদিবসের মধ্যে নামজারি সম্পন্ন করার কথা থাকলেও, বাস্তবে এই প্রক্রিয়া শেষ হতে প্রায়শই কয়েক মাস বা বছর পেরিয়ে যেত। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আবেদনের নিষ্পত্তি হতে ২৫ দিনের বেশি সময় লাগত, যা জনভোগান্তির মূল কারণ।
- দুর্নীতি ও ঘুষ: ভূমি অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও দালালদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষকে দ্রুত কাজ সারার জন্য অনৈতিক লেনদেনে জড়িয়ে পড়তে হতো। ফাইল সরিয়ে রাখা, অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জন্য চাপ দেওয়া, কিংবা বারবার অফিসে ঘোরাতে বাধ্য করা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এই ধরনের দুর্নীতি ভূমি সেবার প্রতি মানুষের আস্থাকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে।
- কাগজপত্রের জটিলতা: আবেদনপত্রের সঙ্গে একাধিক প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যেমন—দলিল বা বায়না দলিলের মূল কপি, খাজনা পরিশোধের রশিদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, খতিয়ানের সত্যায়িত কপি, ওয়ারিশ সনদ (যদি প্রযোজ্য হয়) ইত্যাদি জমা দিতে হতো। এই কাগজপত্র সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়াও ছিল অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ।
কেন নামজারি অপরিহার্য?
অনেকেই মনে করেন যে জমি কেনার দলিল হাতে থাকলেই মালিকানা নিশ্চিত হয়। কিন্তু এটি একটি ভুল ধারণা। আইনগতভাবে, জমির মালিকানা তখনই পূর্ণতা পায় যখন সরকারি রেকর্ড বা খতিয়ানে আপনার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। নামজারি না করালে ভবিষ্যতে বেশ কিছু মারাত্মক জটিলতার শিকার হতে পারেন:
- আইনি বিরোধ: জমির প্রকৃত মালিক হওয়া সত্ত্বেও সরকারি রেকর্ডে পুরোনো মালিকের নাম থাকলে তৃতীয় পক্ষের কাছে জমি বিক্রি বা জালিয়াতির শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
- ভূমি উন্নয়ন কর: নামজারি না হলে আপনি আপনার নামে ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধ করতে পারবেন না, যা পরবর্তীতে আইনি ঝামেলা তৈরি করতে পারে।
- হস্তান্তর সমস্যা: ভবিষ্যতে জমি বিক্রি, দান বা অন্য কোনো উপায়ে হস্তান্তর করতে গেলে নামজারি না করা থাকলে গুরুতর সমস্যা তৈরি হবে। তাই আইনগত ও ব্যবহারিক উভয় দিক থেকেই নামজারি অত্যাবশ্যক।
রেজিস্ট্রেশন-মিউটেশন আন্তঃসংযোগের পটভূমি
২০২৩ সালের ২৯ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই যুগান্তকারী রেজিস্ট্রেশন-মিউটেশন আন্তঃসংযোগ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। এর মূল লক্ষ্য হলো সাব-রেজিস্ট্রার অফিস (দলিল নিবন্ধন অফিস) এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড অফিসের মধ্যে একটি শক্তিশালী ডিজিটাল সেতু স্থাপন করা। ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই নতুন ব্যবস্থা ইতোমধ্যে দেশের ৩০টিরও বেশি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। এখন তা সারাদেশে চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ভূমি উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দৃঢ়ভাবে আশাবাদী যে এই বছরের মধ্যেই ভূমি মালিকরা নতুন স্বয়ংক্রিয় নামজারি ব্যবস্থার সুফল পাবেন।
স্বয়ংক্রিয় নামজারির কি?
স্বয়ংক্রিয় নামজারি বলতে এমন একটি প্রক্রিয়াকে বোঝায় যেখানে—
- ম্যানুয়াল আবেদন বাতিল: নতুন মালিককে আলাদা করে নামজারির জন্য কোনো আবেদন দাখিল করতে হয় না।
- তাৎক্ষণিক যাচাই: দলিল রেজিস্ট্রির সময়ই জমির দাতা ও ক্রেতার তথ্য, খতিয়ান এবং ভূমি অফিসের রেকর্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে (সিস্টেম টু সিস্টেম) যাচাই হয়।
- স্বয়ংক্রিয় পরিবর্তন: যাচাই সম্পন্ন হলে কোনো প্রকার বিলম্ব ছাড়াই নতুন মালিকের নামে খতিয়ান ও হোল্ডিং নম্বর প্রস্তুত হয়ে যায়।
এই স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়াটি প্রচলিত ‘ই-নামজারি’ (যেখানে আবেদন করতে হয়) থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অনেক বেশি উন্নত।
দলিল রেজিস্ট্রির সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় নামজারি প্রক্রিয়া যেভাবে কাজ করবে (Step-by-Step)
স্বয়ংক্রিয় নামজারি প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দ্রুত, সুরক্ষিত এবং প্রযুক্তি-নির্ভর। এর মূল চালিকাশক্তি হলো ডিজিটাল ডেটা ইন্টিগ্রেশন এবং স্বয়ংক্রিয় যাচাইকরণ। নিচে এই প্রক্রিয়ার ধাপগুলো বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. দলিল দাখিল ও ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ
ক্রেতা ও বিক্রেতা যখন সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে দলিল রেজিস্ট্রির জন্য উপস্থিত হন, তখন সাব-রেজিস্ট্রার কর্তৃক দাতার এবং ক্রেতার প্রয়োজনীয় তথ্য সরকারি সার্ভারে দাখিল করা হয়। এই তথ্যের মধ্যে দাতা ও গ্রহীতার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নম্বর, দলিলের বিবরণ, দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর এবং জমির পরিমাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ডেটা অন্তর্ভুক্ত থাকে।
২. ডিজিটাল যাচাই প্রক্রিয়া: দাতার সত্যতা ও বিরোধ নিরসন
এটি স্বয়ংক্রিয় নামজারির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। সাব-রেজিস্ট্রার কর্তৃক তথ্য দাখিল করার সঙ্গে সঙ্গেই তা ভূমি মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় সার্ভারে চলে যায়। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং সমন্বিত সফটওয়্যারের মাধ্যমে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো যাচাই করা হয়:
- দাতা আসল মালিক কিনা: NID-এর তথ্য ব্যবহার করে সার্ভার যাচাই করে যে দাতা আসলেই রেকর্ডের খতিয়ানে থাকা ব্যক্তি কিনা।
- জমিতে কোনো বিরোধ আছে কিনা: সংশ্লিষ্ট জমির দাগ ও খতিয়ান নম্বর ব্যবহার করে সরকারি ভূমি ডাটাবেসে (যেমন ভূমি উন্নয়ন কর ডাটাবেস, খাস জমি রেকর্ড) কোনো আইনি বিরোধ বা মামলার তথ্য আছে কিনা, তা পরীক্ষা করা হয়।
- খতিয়ান হালনাগাদ রয়েছে কিনা: দাতার নামে জমাখারিজ বা খতিয়ান হালনাগাদ আছে কিনা, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিশ্চিত করা হয়।
এই স্বয়ংক্রিয় যাচাই সম্পন্ন হওয়ার জন্য কোনো মানুষের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয় না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সার্ভার একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে প্রস্তুত হয়।
৩. ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ও তাৎক্ষণিক নামজারি
ডিজিটাল যাচাই প্রক্রিয়ায় যদি সব তথ্য সঠিক পাওয়া যায়, এবং জমির মালিকানা হস্তান্তরে কোনো সমস্যা না থাকে, তবে সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভূমি অফিস থেকে একটি ‘গ্রিন সিগন্যাল’ বা সবুজ সংকেত পাঠানো হয়। এই সংকেত পাওয়ামাত্র দলিল রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করার অনুমতি দেওয়া হয়।
দলিল রেজিস্ট্রির সঙ্গে সঙ্গেই:
- স্বয়ংক্রিয় পরিবর্তন: নতুন মালিকের নামে নামজারি হয়ে যায়।
- তাৎক্ষণিক প্রমাণ: নতুন মালিকের নামে খতিয়ান (Record of Rights), হোল্ডিং নম্বর এবং ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) প্রদানের পূর্ণাঙ্গ কাগজপত্র বা রসিদ (DCR) একসঙ্গে প্রস্তুত হয়ে যায়, যা অনলাইনে ডাউনলোড করা সম্ভব হবে।
অর্থাৎ, নতুন মালিককে আর আলাদা করে নামজারির আবেদন বা ভূমি অফিসে দৌড়ঝাঁপ করতে হবে না। রেজিস্ট্রির দিনই তিনি জমির পূর্ণাঙ্গ আইনগত মালিক হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি পাবেন।
৪. ডি-লিঙ্কিং ও বিরোধপূর্ণ জমির ক্ষেত্রে করণীয়
যদি যাচাই প্রক্রিয়ায় কোনো ত্রুটি ধরা পড়ে (যেমন: দাতার নামের সঙ্গে NID বা খতিয়ানের মিল না থাকা, কিংবা জমিতে আইনি বিরোধ থাকা), তবে সিস্টেম তৎক্ষণাৎ একটি ‘রেড সিগন্যাল’ বা লাল সংকেত পাঠাবে। এক্ষেত্রে:
- দলিল রেজিস্ট্রি স্থগিত থাকবে।
- ক্রেতা ও বিক্রেতাকে সমস্যা সমাধানে ভূমি অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।
- সমস্যা সমাধান সাপেক্ষে পুরনো ই-নামজারি পদ্ধতি বা ভূমি রাজস্ব মামলার মাধ্যমে নামজারির জন্য আবেদন করতে হতে পারে।
এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাটি শুধুমাত্র বিতর্কহীন এবং ত্রুটিমুক্ত জমির ক্ষেত্রেই দ্রুত নামজারি নিশ্চিত করবে।
ই-মিউটেশন (E-Mutation) ও অটো-মিউটেশনের মধ্যে পার্থক্য
ভূমি মন্ত্রণালয় কয়েক বছর আগে ই-মিউটেশন বা অনলাইন নামজারি ব্যবস্থা চালু করেছিল, যা ম্যানুয়াল পদ্ধতির তুলনায় অনেক উন্নত ছিল। কিন্তু নতুন স্বয়ংক্রিয় নামজারি (Auto-Mutation) পদ্ধতিটি ই-মিউটেশনকেও কয়েক ধাপ ছাড়িয়ে গেছে।
| বৈশিষ্ট্যের ভিত্তি | ই-মিউটেশন (E-Mutation) (প্রচলিত অনলাইন পদ্ধতি) | স্বয়ংক্রিয় নামজারি (Auto-Mutation) (নতুন পদ্ধতি) |
| আবেদনের প্রয়োজনীয়তা | ক্রেতাকে দলিল রেজিস্ট্রির পর আলাদাভাবে অনলাইনে আবেদন করতে হতো। | কোনো আবেদনের প্রয়োজন নেই। |
| শুরুর সময় | দলিল রেজিস্ট্রির পরে নতুন মালিককে শুরু করতে হতো। | দলিল রেজিস্ট্রির সময় সাব-রেজিস্ট্রার অফিস থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুরু হয়। |
| সময়কাল | সরকারিভাবে ৪৫-৬০ কর্মদিবস (বাস্তবে আরও বেশি)। | দলিল রেজিস্ট্রির মুহূর্তেই সম্পন্ন। সময়কাল প্রায় শূন্য। |
| যাচাই প্রক্রিয়া | আবেদন দাখিলের পর ভূমি অফিস (এসিল্যান্ড) কর্তৃক ম্যানুয়াল তদন্ত/শুনানি। | কেন্দ্রীয় সার্ভারে ডিজিটাল পদ্ধতিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য যাচাই। |
| দুর্নীতির সুযোগ | শুনানি বা তদন্ত পর্যায়ে কিছু ক্ষেত্রে দালালি বা হয়রানির সুযোগ ছিল। | দুর্নীতি বা হয়রানির সুযোগ নেই, কারণ মানুষের হস্তক্ষেপ প্রায় অনুপস্থিত। |
| মূল ভিত্তি | আবেদন-ভিত্তিক ডিজিটাল প্রক্রিয়া। | রেজিস্ট্রেশন-মিউটেশন আন্তঃসংযোগ প্রক্রিয়া। |
স্বয়ংক্রিয় নামজারি ব্যবস্থার ফলে ভূমি মালিককে এখন আর নামজারি আবেদন নিয়ে চিন্তাই করতে হবে না। এটি প্রক্রিয়াটিকে সম্পূর্ণরূপে ‘প্রো-অ্যাকটিভ’ বা সক্রিয় করে তুলেছে।
নতুন পদ্ধতির মূল সুবিধা ও অর্থনৈতিক প্রভাব
স্বয়ংক্রিয় নামজারি ব্যবস্থা চালু হলে বাংলাদেশের ভূমি খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। এর সুবিধাগুলো বহুমুখী এবং অর্থনৈতিকভাবেও সুদূরপ্রসারী।
১. দুর্নীতি ও হয়রানি চিরতরে বন্ধ
নতুন স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায় মানুষের ম্যানুয়াল হস্তক্ষেপ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। জমির দাতা ও ক্রেতার তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই হওয়ায় আবেদন, ঘুষ, ফাইল আটকে রাখা—এই ধরনের দুর্নীতি ও হয়রানির সুযোগ বন্ধ হবে। ভূমি উপদেষ্টা যেমন বলেছেন, “এটি কার্যকর হলে নামজারি সংক্রান্ত দুর্নীতি, দেরি ও হয়রানি চিরতরে বন্ধ হবে।” এটি ভূমি সেবার ক্ষেত্রে এক নতুন ‘নৈতিক স্ট্যান্ডার্ড’ তৈরি করবে।
২. সময় সাশ্রয় ও দক্ষতা বৃদ্ধি
আগে যেখানে নামজারির জন্য কয়েক সপ্তাহ বা মাস লেগে যেত, এখন তা মুহূর্তের মধ্যে সম্পন্ন হবে। এতে একদিকে যেমন নাগরিকের মূল্যবান সময় সাশ্রয় হবে, তেমনই অন্যদিকে ভূমি অফিসের কর্মদক্ষতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কর্মীরা ম্যানুয়াল ফাইল পরিচালনার বদলে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমি সেবায় মনোযোগ দিতে পারবেন।
৩. মালিকানা সুরক্ষায় তাৎক্ষণিক নিশ্চয়তা
দলিল রেজিস্ট্রির সঙ্গে সঙ্গেই খতিয়ানে নাম উঠে যাওয়ায় নতুন মালিক তার সম্পত্তির আইনগত মালিকানার নিশ্চয়তা তাৎক্ষণিকভাবে পেয়ে যাবেন। ফলে জালিয়াতির মাধ্যমে সম্পত্তি হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি কমে যাবে। ভূমি মালিক পাবেন খতিয়ান, হোল্ডিং নম্বর ও খাজনা প্রদানের পূর্ণাঙ্গ কাগজপত্র একসঙ্গে।
৪. সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা
স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের প্রক্রিয়াও সহজ হয়ে যাবে। নতুন মালিক সময়মতো খাজনা পরিশোধ করতে সক্ষম হওয়ায় সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে। স্বচ্ছ ও দ্রুত ভূমি ব্যবস্থাপনার কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা জমি কেনাবেচায় আরও বেশি আস্থা পাবেন, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নে সহায়ক হবে। দ্রুত জমির হস্তান্তরযোগ্যতা নিশ্চিত হওয়ায় অর্থনীতিতে টাকার প্রবাহও বৃদ্ধি পাবে।
বাস্তবায়ন অবস্থা, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
ভূমি মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই বছরের মধ্যেই স্বয়ংক্রিয় নামজারি ব্যবস্থাটি সারাদেশে পুরোপুরি চালু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে একটি বড় পরিবর্তনের পথে কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করাও জরুরি।
পাইলট প্রকল্পের সাফল্য ও দেশব্যাপী সম্প্রসারণ
ভূমি মন্ত্রণালয় একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এই কার্যক্রম শুরু করেছে। ইতোমধ্যে দেশের ৩০টিরও বেশি উপজেলায় (কিছু তথ্য অনুযায়ী, ২১ বা ১৭টি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে) পাইলট প্রকল্প হিসেবে এটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। এই পাইলট প্রকল্পগুলো থেকে পাওয়া ডেটা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রযুক্তিগত ত্রুটিগুলো দূর করা হচ্ছে, যাতে দেশব্যাপী সম্পূর্ণ নির্বিঘ্নে এই পদ্ধতি চালু করা যায়। ২০২৪ সালের প্রথমার্ধেই দেশব্যাপী রেজিস্ট্রেশন-মিউটেশন আন্তঃসংযোগ সম্ভব হবে বলে ভূমি সচিব জানিয়েছেন (সূত্র মতে)।
প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ ও ডেটা ইন্টিগ্রেশন
স্বয়ংক্রিয় নামজারি পদ্ধতির সাফল্যের মূল ভিত্তি হলো ভূমি রেজিস্ট্রেশন বিভাগ (সাব-রেজিস্ট্রার অফিস) এবং ভূমি প্রশাসন বিভাগ (এসিল্যান্ড অফিস) এর মধ্যে ডেটার নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ স্থাপন। এর জন্য প্রয়োজন—
- ১০০% ডিজিটাল রেকর্ড: দেশের সমস্ত খতিয়ান, দাগ ও ম্যাপের তথ্য নির্ভুলভাবে সরকারি ডাটাবেসে ডিজিটাল আকারে থাকতে হবে। পুরোনো ম্যানুয়াল রেকর্ডগুলো দ্রুত ডিজিটালাইজ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
- সফটওয়্যার নিরাপত্তা: সংবেদনশীল ভূমি ডেটা সুরক্ষার জন্য সর্বোচ্চ মানের সফটওয়্যার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
- প্রশিক্ষণ: সাব-রেজিস্ট্রার ও ভূমি অফিসের কর্মীদের এই নতুন সফটওয়্যার ও পদ্ধতির উপর সম্পূর্ণ প্রশিক্ষণ প্রদান করা।
ভূমি মন্ত্রণালয় প্রায় ১৭টি ভূমি সেবাকে সম্পূর্ণরূপে অটোমেটেড করার লক্ষ্য নিয়েছে, যার মধ্যে এই স্বয়ংক্রিয় নামজারি অন্যতম। এটি ‘ডিজিটাল ভূমি সেবা’ নিশ্চিত করার পথে একটি বিশাল পদক্ষেপ।
ভূমি মালিকদের জন্য নির্দেশিকা ও করণীয়
যদিও নামজারি প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাচ্ছে, একজন ভূমি মালিক হিসেবে আপনার কিছু প্রস্তুতি ও দায়িত্ব রয়েছে, যা এই প্রক্রিয়াকে আরও মসৃণ করবে।
- ১. NID তথ্যের সঠিকতা নিশ্চিত করুন: আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এবং জমির খতিয়ানে থাকা নামের বানানের মধ্যে যেন কোনো প্রকার অসঙ্গতি না থাকে, তা নিশ্চিত করুন। স্বয়ংক্রিয় যাচাইকরণের সময় NID একটি মূল ভূমিকা পালন করবে।
- ২. পুরোনো রেকর্ড হালনাগাদ রাখুন: আপনি যে জমি কিনছেন, সেই জমির পুরোনো মালিকের খতিয়ান এবং জমা-খারিজ বা খতিয়ান হালনাগাদ আছে কিনা, তা ক্রয়ের আগেই নিশ্চিত করুন। বিরোধপূর্ণ বা অসম্পূর্ণ রেকর্ডের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় নামজারি হবে না।
- ৩. সঠিক ফি পরিশোধ: দলিল রেজিস্ট্রির সময় সব সরকারি ফি সঠিকভাবে পরিশোধ হয়েছে কিনা, তা নিশ্চিত করুন। এই ফি-র সঙ্গেই স্বয়ংক্রিয় নামজারির খরচ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
- ৪. অফিসিয়াল পোর্টাল ব্যবহার: কোনো প্রকার দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর শরণাপন্ন না হয়ে, সরাসরি সরকারি ওয়েবসাইট (land.gov.bd বা mutation.land.gov.bd) ব্যবহার করুন। আবেদনকারী মোবাইল ওয়ালেট, ইন্টারনেট ব্যাংকিং বা বিকাশ, নগদ, রকেট ইত্যাদির মাধ্যমে নামজারির ফি পরিশোধ করতে পারবেন।
- ৫. ট্র্যাকিং ও পর্যবেক্ষণ: যদিও আবেদনের প্রয়োজন নেই, কিন্তু দলিল রেজিস্ট্রির পর যদি কোনো কারণে সমস্যা হয়, তবে আপনি অনলাইনে আবেদন ট্র্যাকিং করে আপনার জমির নামজারির অবস্থা বা কেন তা স্থগিত হলো, তার বিস্তারিত জানতে পারবেন।
শেষ কথা
স্বয়ংক্রিয় নামজারি পদ্ধতি চালু হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ তার ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। এই ব্যবস্থা কেবল একটি প্রশাসনিক সংস্কার নয়, এটি দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ এবং জনবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনার প্রতি সরকারের অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
অতীতের নামজারি নিয়ে বছরের পর বছর ঝুলে থাকা আবেদন, জনগণের দুর্ভোগ এবং ভূমি অফিসের দুর্নীতি এখন ইতিহাসের অংশ হতে চলেছে। দলিল রেজিস্ট্রির সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় নামজারি প্রক্রিয়াটি কার্যকর হলে ভূমি মালিকরা নির্ভয়ে এবং দ্রুততম সময়ে তাদের সম্পত্তির আইনগত অধিকার নিশ্চিত করতে পারবেন। এই যুগান্তকারী পরিবর্তন ভূমি মালিকদের জন্য শুধু স্বস্তিই আনবে না, বরং ভূমি সংক্রান্ত আইনি জটিলতা কমিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এখন অপেক্ষা শুধু সারাদেশে এই পদ্ধতির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের।



