বাংলাদেশে জমি বা সম্পত্তি সম্পর্কিত যেকোনো আইনি কার্যক্রমে জাবেদা নকল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি। মূল দলিল হারিয়ে গেলে, আইনি জটিলতা দেখা দিলে, অথবা জমির মালিকানা প্রমাণ করতে হলে জাবেদা নকল অত্যাবশ্যক। এই গাইডে জানানো হলো— জাবেদা নকল কী, কেন প্রয়োজন, কীভাবে আবেদন করতে হয়, কোথা থেকে পাওয়া যায়, কত খরচ হয়, এবং কোন কোন তথ্য জানা জরুরি।
জাবেদা নকল কী?
জাবেদা নকল হলো মূল দলিলের একটি সত্যায়িত অনুলিপি, যা সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে সরবরাহ করা হয়। এটি মূল দলিলের মতোই আইনগতভাবে কার্যকর।
যেমন—
- মূল দলিল হারিয়ে গেলে
- আদালতে জমি সম্পর্কিত মামলা হলে
- ব্যাংকে লোন করতে হলে
- জমির মালিকানা প্রমাণ করতে হলে
- জমি বিক্রির প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত যাচাই প্রয়োজন হলে
সেক্ষেত্রে জাবেদা নকল অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের নিবন্ধন আইন, নিবন্ধন বিধিমালা ও সংশ্লিষ্ট ম্যানুয়াল অনুযায়ী এই নকল সংগ্রহ ও ব্যবহারের বিধান নির্ধারিত।
কেন জাবেদা নকল প্রয়োজন?
জাবেদা নকল একাধিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ, যেমন—
১. মূল দলিল হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত হলেঃ চুরি, আগুন, দুর্ঘটনা বা অযত্নের কারণে মূল দলিল নষ্ট হলে জাবেদা নকলই একমাত্র আইনগত বিকল্প।
২. আদালতে মামলা পরিচালনায়ঃ জমি সংক্রান্ত মামলায় দলিলের কপি প্রমাণ হিসেবে দাখিল করতে হয়। মূল দলিল না থাকা অবস্থায় নকল আদালতে গ্রহণযোগ্য।
৩. ব্যাংক লোন ও আর্থিক যাচাইঃ ব্যাংক অনেক সময় জাবেদা নকল যাচাই করে লোন অনুমোদন করে।
৪. জমির মালিকানা প্রমাণঃ বিবাদ বা জমি দখল সংক্রান্ত জটিলতায় নকল দলিল মালিকানা প্রমাণে সহায়ক হয়।
৫. রেকর্ড যাচাই বা তল্লাশের জন্যঃ জমি কেনা-বেচার আগে দলিল সত্যতা যাচাই করতে নকল সংগ্রহ করা হয়।
জাবেদা নকল কোথা থেকে পাওয়া যায়?
জাবেদা নকল পাওয়া যায়—
- সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস
- যে অফিসে মূল দলিল নিবন্ধন করা হয়েছিল
এছাড়া অনলাইনে সরাসরি নকল এখনো পাওয়া যায় না, তবে আবেদন প্রক্রিয়া অনেক অফিসে ডিজিটাল করা হয়েছে।
জাবেদা নকল তোলার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য
আবেদন করার সময় সাধারণত নিচের তথ্যগুলো দিতে হয়—
- দলিল নম্বর
- নিবন্ধনের সাল
- দাতা (Seller) ও গ্রহীতার (Buyer) নাম
- মৌজা
- খতিয়ান নম্বর
- দাগ নম্বর
- জমির পরিমাণ
- রেজিস্ট্রি অফিসের নাম
যদি আপনার কাছে মূল দলিল থাকে, তাহলে সর্বশেষ পৃষ্ঠায় বালাম বইয়ের তথ্য থাকে—যা থেকে খুব সহজেই নকল পাওয়া যায়।
জাবেদা নকল তোলার নিয়মাবলী (ধাপে ধাপে গাইড)
এটি হলো সম্পূর্ণ নিয়ম, যেভাবে বাংলাদেশে জাবেদা নকল তোলা হয়।
১. আবেদন ফরম সংগ্রহ ও পূরণ
জাবেদা নকলের জন্য সাধারণত ৩৬ ও ৩৭ নম্বর ফরম ব্যবহার করা হয়।
ফরমে যে তথ্যগুলো দিতে হয়—
- দলিল নম্বর
- দলিলের সাল
- দাতা ও গ্রহীতার নাম
- জমির বিবরণ
- মৌজা / খতিয়ান / দাগ নম্বর
- আবেদনকারীর নাম ও মোবাইল নম্বর
অনেক সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বর্তমানে আবেদন ফরম অনলাইনেও পাওয়া যায়।
২. কোর্ট ফি যুক্ত করা
আবেদনের সাথে ২০ টাকার কোর্ট ফি সংযুক্ত করতে হয়।
৩. দলিল তল্লাশ ও পরিদর্শন (যদি প্রয়োজন হয়)
যদি দলিল নম্বর জানা না থাকে বা মূল দলিল না থাকে, তাহলে আগে তল্লাশ ও পরিদর্শন করতে হয়।
এক্ষেত্রে—
- এফ(১) ফি — সূচিপত্র তল্লাশ ফি — ২০ টাকা
- এফ(২) ফি — পরিদর্শন ফি — ১০ টাকা
তল্লাশের মাধ্যমে রেজিস্ট্রি অফিসের ইনডেক্স বই থেকে দলিলের রেকর্ড খুঁজে বের করা হয়।
৪. আবেদন জমা
ফরম পূরণ, প্রয়োজনীয় তথ্য সংযুক্ত করা, ফি প্রদান—সব সম্পন্ন করে আবেদন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমা দিন।
সাধারণত একটি রিসিভ কপি দেওয়া হয়।
৫. নকল প্রস্তুত ও তুলনা
আবেদন পাওয়ার পর—
- রেজিস্ট্রারে এন্ট্রি করা হয়
- নকল লেখা বা টাইপ করা হয়
- সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা সাব-রেজিস্ট্রার যাচাই করে
- স্বাক্ষর প্রদান করেন
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, কারণ নকল অবশ্যই মূল দলিলের সাথে শব্দ-শব্দ মিলিয়ে তৈরি করা হয়।
৬. নকল গ্রহণ
সাধারণত ১–৫ দিনের মধ্যে নকল পাওয়া যায়।
অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দিলে আরও দ্রুত পাওয়া যায়।
কখনও রেকর্ড বেশি হলে ৭–১০ দিনও লেগে যেতে পারে।
জাবেদা নকল তোলার খরচ (পূর্ণ তালিকা)
জাবেদা নকল তোলার খরচ বিভিন্ন ফি এর ওপর নির্ভর করে—দলিলের আকার, পাতার সংখ্যা, শব্দ সংখ্যা ও অগ্রাধিকার সেবা ইত্যাদি।
১. স্ট্যাম্প শুল্ক (Stamp Duty)
- মূল দলিলে স্ট্যাম্প ≤ ১০০০ টাকা হলে: ১০০ টাকা
- অন্য সব ক্ষেত্রে: ২০০ টাকা
২. জি(এ) ফি
বাংলায় লেখা প্রতি ৩০০ শব্দ বা তার অংশবিশেষ অনুযায়ী:
- সাধারণ নকল: ১৬ টাকা
- দলিলের নকল গ্রহণ ফি: ২৪ টাকা
৩. জিজি ফি
- প্রতি ৩০০ শব্দে: ৩৬ টাকা
৪. কোর্ট ফি
- আবেদন ফরমের জন্য: ২০ টাকা
৫. তল্লাশ ও পরিদর্শন ফি
যদি প্রয়োজন হয়—
- এফ(১): ২০ টাকা
- এফ(২): ১০ টাকা
৬. অগ্রাধিকার ফি
দ্রুত নকল পেতে হলে:
- বেসিক অগ্রাধিকার ফি: ৫০ টাকা
- ৪ পৃষ্ঠার বেশি হলে প্রতিপৃষ্ঠা ১৫ টাকা
৭. মুদ্রিত/টাইপকৃত নকলের অর্ধেক ফি
যদি আবেদনকারী নিজে টাইপ বা প্রিন্ট করা কপি জমা দেন, তাহলে—
- জি + জিজি ফি-এর ৫০%
মোট খরচের হিসাব (উদাহরণ)
আপনার প্রদত্ত তথ্য ও সাধারণ হিসাব অনুযায়ী একটি দলিলের মোট খরচ প্রায়—
| ফি এর ধরন | পরিমাণ |
| স্ট্যাম্প শুল্ক | ২০০ টাকা |
| এফ(১) তল্লাশ | ২০ টাকা |
| এফ(২) পরিদর্শন | ১০ টাকা |
| জি(এ) ফি | ২৪০ টাকা |
| জিজি ফি | ৩৬০ টাকা |
| কোর্ট ফি | ২০ টাকা |
| মোট | ৮৫০ টাকা (চূড়ান্তভাবে অফিসভেদে ভিন্ন হতে পারে) |
দলিল যত বড় হবে, শব্দ সংখ্যা যত বেশি হবে—খরচ তত বাড়বে।
জাবেদা নকল পেতে কত সময় লাগে?
সাধারণত ১ থেকে ৫ কর্মদিবস।
যদি রেকর্ড পুরনো হয় বা তল্লাশ প্রয়োজন হয়—৭–১০ দিনও লাগতে পারে।
অগ্রাধিকার ভিত্তিতে (Priority Copy) দিলে ১ দিনের মধ্যেও পাওয়া যায়।
জাবেদা নকল নিতে হলে কি উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক?
না, বাধ্যতামূলক নয়।
তবে:
- আবেদনকারী ব্যক্তিগতভাবে
অথবা - একটি অথরাইজেশন লেটারসহ প্রতিনিধি
নকল সংগ্রহ করতে পারে।
জাবেদা নকল কি আদালতে গ্রহণযোগ্য?
হ্যাঁ, ১০০% গ্রহণযোগ্য। এটি সত্যায়িত কপি, যা মূল দলিলের সমমানের কার্যকারিতা বহন করে, যদিও এটি মূল নয়।
জাবেদা নকল হারিয়ে গেলে কী করবেন?
আবার নতুন করে নকল তোলা যায়। অসংখ্যবার নকল তোলার কোনো আইনগত সীমা নেই।
অনলাইনে দলিলের নকল পাওয়া যায় কি?
বর্তমানে বাংলাদেশে জাবেদা নকল পুরোপুরি অনলাইনে পাওয়া যায় না। তবে কিছু সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে—
- অনলাইনে আবেদন
- অনলাইনে স্ট্যাটাস চেক
- অনলাইন পেমেন্ট
এসব চালু হয়েছে। শীঘ্রই পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে।
জাবেদা নকল তোলার সময় সাধারণ ভুল এবং সতর্কতা
১. দলিল নম্বর বা সাল ভুল দেওয়াঃ এর কারণে তল্লাশ করতে হয়, সময় ও খরচ দুইই বাড়ে।
২. ভুল মৌজা / খতিয়ান নম্বরঃ নকল প্রস্তুত করতে সমস্যা হয়।
৩. প্রতিনিধি পাঠালে অথরাইজেশন লেটার ভুলে যাওয়াঃ অনেক অফিসে কড়াকড়িভাবে তা চাওয়া হয়।
৪. পর্যাপ্ত টাকা না নেওয়াঃ শব্দ সংখ্যা বেশি হলে অতিরিক্ত খরচ বাড়তে পারে।
৫. নকল পরীক্ষার সময় ভুল নজর এড়িয়ে যাওয়াঃ নকল পাওয়ার পর প্রতিটি পৃষ্ঠা দেখে নিতে হবে—
- নাম
- জমির পরিমাণ
- সীমা বিবরণ
- কোনো ভুল আছে কি না।
জাবেদা নকল সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)
১. নকল কি মূল দলিলের সমান বৈধ?
ব্যবহারিকভাবে—হ্যাঁ।
আইনগতভাবে—এটি কপি, কিন্তু প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
২. কত পৃষ্ঠার হলে খরচ বাড়বে?
প্রতি ৩০০ শব্দে এক পৃষ্ঠা গণনা করা হয়।
সুতরাং শব্দ বাড়লে খরচ বাড়বে।
৩. অন্য জেলার অফিস থেকে নকল পাওয়া যাবে?
না।
দলিল যেখানে নিবন্ধিত, শুধু সেখান থেকেই নকল পাওয়া যায়।
৪. তল্লাশ ছাড়া নকল পাওয়া যায় কি?
হ্যাঁ, যদি—
- আপনার কাছে দলিল নম্বর থাকে
- মূল দলিল থাকে
- বালাম নম্বর জানা থাকে
উপসংহার
জাবেদা নকল বাংলাদেশে জমি মালিকানা নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নথি। নিয়ম জানা না থাকলে অনেকেই বিভ্রান্ত হন, ভুল দেন, অতিরিক্ত খরচ হয় বা সময় নষ্ট হয়। এই গাইডটি অনুসরণ করলে সহজেই—
- কোথায় আবেদন করতে হবে
- কী তথ্য প্রয়োজন
- কত খরচ হবে
- কীভাবে নকল তুলতে হয়
সবকিছু বুঝে যেকোনো সময় নিজের দলিলের জাবেদা নকল সংগ্রহ করতে পারবেন।



