জমি বা ফ্ল্যাট কেনা জীবনের একটি বড় বিনিয়োগ। কিন্তু শুধু টাকা দিলেই আপনি মালিক হয়ে যান না — আইনগতভাবে মালিকানা নিশ্চিত করতে হলে দলিল রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক।
চলুন জেনে নেই— জমির দলিল রেজিস্ট্রি করার সম্পূর্ণ নিয়ম ও করণীয় বিষয়গুলো।
ধাপ ১: রেজিস্ট্রেশনের পূর্বপ্রস্তুতি
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যাওয়ার আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি নিতে হয়। এই ধাপেই অনেক ভুল হয়, তাই এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ক) মালিকানা ও কাগজপত্র যাচাই
সম্পত্তি কেনার আগে বিক্রেতার মালিকানা ও দলিলের বৈধতা যাচাই করুন।
যেসব কাগজপত্র অবশ্যই দেখে নিতে হবে:
- পূর্বের দলিল ও খতিয়ান
- দাগ, মৌজা ও পরিমাণ যাচাই
- বিক্রেতার জাতীয় পরিচয়পত্র
- জমির কর রশিদ
খ) দলিলের খসড়া (Drafting)
একজন অভিজ্ঞ দলিল লেখক বা আইনজীবী দিয়ে দলিলের খসড়া প্রস্তুত করুন।
দলিলে অবশ্যই উল্লেখ থাকতে হবে:
- ক্রেতা ও বিক্রেতার নাম, ঠিকানা, NID নম্বর
- জমির পূর্ণ তফসিল (মৌজা, দাগ, খতিয়ান, চৌহদ্দি)
- জমির মূল্য ও পরিশোধের বিবরণ
গ) সরকারি ফি ও কর পরিশোধ
জমির মূল্যের ওপর ভিত্তি করে সরকার নির্ধারিত:
- স্ট্যাম্প শুল্ক
- রেজিস্ট্রেশন ফি
- উৎস কর (AIT)
- স্থানীয় সরকার কর (LG Tax)
এসব ফি ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করে পে-অর্ডার সংগ্রহ করতে হবে।
💡 টিপস: দলিল রেজিস্ট্রেশনের সরকারি ফি অঞ্চল ও জমির মূল্যের ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হয়। আগে থেকে হিসাব করে রাখলে ঝামেলা কমবে।
ধাপ ২: সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রেশনের দিন
সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে নির্ধারিত দিনে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যেতে হবে।
ক) কাগজপত্র জমা
রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মকর্তার কাছে দলিলের খসড়া, মূল পে-অর্ডার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিন।
খ) দাতা-গ্রহীতা শনাক্তকরণ
সাব-রেজিস্ট্রারের সামনে বিক্রেতা সম্পত্তি বিক্রির কথা স্বীকার করেন। এরপর ক্রেতা, বিক্রেতা, সাক্ষী ও শনাক্তকারী—সবার পরিচয় যাচাই করা হয়।
গ) স্বাক্ষর ও আঙুলের ছাপ প্রদান
সব পক্ষ দলিলে এবং অফিসের রেজিস্টার বইতে (বালাম বই) স্বাক্ষর করবেন।
এরপর ডিজিটাল মেশিনে আঙুলের ছাপ ও ছবি তোলা হয়।
এই ধাপের পরই দলিলটি আইনগতভাবে নিবন্ধিত হয়।
ধাপ ৩: রেজিস্ট্রেশনের পরবর্তী করণীয়
ক) মূল দলিল সংগ্রহ
রেজিস্ট্রেশনের পর দলিলটি অফিসে প্রক্রিয়াধীন থাকে।
সাধারণত ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে মূল দলিল সংগ্রহ করা যায়।
দলিল জমা দেওয়ার সময় পাওয়া রসিদটি যত্নে সংরক্ষণ করুন, এটি পরে মূল দলিল নেওয়ার সময় লাগবে।
খ) নামজারি (Mutation) করা
রেজিস্ট্রেশনের পরপরই আপনার নামে নামজারি আবেদন করতে হবে।
নামজারি করলে সরকারি রেকর্ডে আপনি জমির মালিক হিসেবে নিবন্ধিত হবেন এবং নতুন খতিয়ান পাবেন।
সতর্কতা: নামজারি ছাড়া আপনার মালিকানা অসম্পূর্ণ থাকবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQs)
১. দলিল রেজিস্ট্রি করতে কতদিন লাগে?
সাধারণত একদিনেই দলিল রেজিস্ট্রেশনের কাজ সম্পন্ন হয়।
তবে মূল দলিল হাতে পেতে সময় লাগতে পারে ৩–৬ মাস পর্যন্ত।
২. যদি কোনো পক্ষ অনুপস্থিত থাকে তাহলে কী হবে?
ক্রেতা বা বিক্রেতা কেউ অনুপস্থিত থাকলে দলিল রেজিস্ট্রি করা যায় না।
তবে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি (Power of Attorney) থাকলে প্রতিনিধি উপস্থিত থাকতে পারেন।
৩. দলিল রেজিস্ট্রির খরচ কত?
জমির দামের ওপর নির্ভর করে। সাধারণত মোট খরচ হয় দলিলের মূল্যের ১০–১২% এর মধ্যে।
সারসংক্ষেপ টেবিল
| ধাপ | কাজের নাম | মূল বিষয় |
|---|---|---|
| ১ | পূর্বপ্রস্তুতি | দলিল যাচাই, খসড়া ও ফি পরিশোধ |
| ২ | অফিসে রেজিস্ট্রি | স্বাক্ষর, আঙুলের ছাপ, ছবি |
| ৩ | পরবর্তী কাজ | মূল দলিল সংগ্রহ ও নামজারি |
উপসংহার
দলিল রেজিস্ট্রি করা আপনার সম্পত্তির আইনগত নিরাপত্তার প্রথম ধাপ।
সব নিয়ম মেনে সঠিকভাবে রেজিস্ট্রি করলে ভবিষ্যতে কোনো আইনি জটিলতা বা মালিকানা বিরোধের আশঙ্কা থাকে না।
তাই জমি কেনার পরপরই রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করুন এবং নামজারি নিশ্চিত করুন।


