জমি/ফ্লাট ক্রয়-বিক্রয় চুক্তিপত্র- নমুনাসহ

জমি, বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনা একজন মানুষের জীবনের অন্যতম বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশে জমি কেনা-বেচার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব এবং আইনি জটিলতা প্রায়শই ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়কে বিপদে ফেলে। মৌখিক কথাবার্তা বা সাধারণ সাদা কাগজে লেখালেখির দিন এখন আর নেই। ২০০৪ সালে আইনের সংশোধনের পর থেকে জমি বা স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয়ের জন্য চুক্তিপত্র (Agreement for Sale বা বায়নানামা) রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এই গাইডে আমরা জমি–বাড়ি ক্রয়-বিক্রয় চুক্তিপত্র বা বায়নানামা তৈরির আদ্যপান্ত আলোচনা করব। আইনের ধারা থেকে শুরু করে দলিলের খসড়া তৈরি—সবকিছুই এখানে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

ফ্ল্যাট ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তিপত্র

জমি–বাড়ি ক্রয়-বিক্রয় চুক্তিপত্র কী?

জমি–বাড়ি ক্রয়-বিক্রয় চুক্তিপত্র, যা আইনি ভাষায় ‘বায়নানামা’ (Bainanama) নামে পরিচিত, হলো ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে সম্পাদিত এমন একটি লিখিত ও আইনি দলিল, যার মাধ্যমে বিক্রেতা ভবিষ্যতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট মূল্যে তার সম্পত্তি ক্রেতার কাছে হস্তান্তর করার প্রতিশ্রুতি দেন।

এটি মূল বিক্রয় দলিল (Saf Kabala) নয়, বরং বিক্রয় কার্যক্রম সম্পন্ন করার পূর্বশর্ত বা প্রাথমিক ধাপ। যখন ক্রেতা সম্পত্তির সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করতে পারেন না বা দলিল রেজিস্ট্রির জন্য প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়, তখন উভয় পক্ষের স্বার্থ সুরক্ষায় এই চুক্তি করা হয়।

কোন তথ্য এটিকে বৈধ করে?

একটি চুক্তিপত্র তখনই আইনিভাবে বৈধ হবে যখন এতে:

১. উভয় পক্ষের সম্মতি ও স্বাক্ষর থাকবে।

২. সম্পত্তির সুস্পষ্ট বিবরণ থাকবে।

৩. নির্দিষ্ট মূল্যের (Consideration) উল্লেখ থাকবে।

৪. স্ট্যাম্প এক্ট অনুযায়ী সঠিক মানের স্ট্যাম্প ব্যবহার করা হবে।

৫. সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রি করা হবে।

জেনে নিনঃচুক্তি ভঙ্গের প্রতিকার: আইনি অধিকার

Registration vs Unregistered Agreement

অনেকে মনে করেন, ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে নোটারি করলেই চুক্তিপাকা হয়ে যায়। এটি একটি বিশাল ভুল ধারণা।

  • রেজিস্টার্ড চুক্তি: সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রি করা বায়নানামা দলিলের আইনি ভিত্তি অত্যন্ত শক্তিশালী। এটি বলবৎ করার জন্য আদালতে মামলা (Specific Performance of Contract) করা যায়।
  • আন-রেজিস্টার্ড চুক্তি: শুধুমাত্র নোটারি করা বা সাধারণ স্ট্যাম্পে লেখা চুক্তি আইনের চোখে এখন আর গ্রহণযোগ্য নয়। ২০০৪ সালের পর থেকে আন-রেজিস্টার্ড বায়নানামা দিয়ে আপনি সম্পত্তির মালিকানা দাবি বা দখল বজায় রাখার জন্য আদালতে সুবিধা পাবেন না।

বাংলাদেশে আইনগত অবস্থান

বাংলাদেশে জমি কেনা-বেচার চুক্তি মূলত দুটি প্রধান আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়:

  1. সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ (Transfer of Property Act, 1882):
    • ধারা ৫৪ক (Section 54A): ২০০৪ সালের সংশোধনী অনুযায়ী, স্থাবর সম্পত্তির বিক্রয় চুক্তি অবশ্যই লিখিত হতে হবে এবং রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ অনুযায়ী রেজিস্ট্রি করতে হবে। মৌখিক চুক্তি বা অনিবন্ধিত চুক্তি সম্পূর্ণ বাতিল বলে গণ্য হবে।
  2. রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ (Registration Act, 1908):
    • ধারা ১৭ক (Section 17A): এই ধারা অনুযায়ী, বিক্রয়ের জন্য চুক্তি (Contract for Sale) অবশ্যই রেজিস্ট্রি করতে হবে। চুক্তি স্বাক্ষরের ৩০ দিনের মধ্যে এটি রেজিস্ট্রির জন্য উপস্থাপন করতে হয়।

কেন চুক্তিপত্র প্রয়োজন?

বায়নানামা বা চুক্তিপত্র শুধুমাত্র একটি কাগজ নয়, এটি আপনার বিনিয়োগের রক্ষাকবচ। কেন এটি এত জরুরি, তার প্রধান কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

১. মালিকানা বা স্বত্ব নিশ্চিতকরণ

চুক্তি করার আগে দলিল যাচাই করার সুযোগ পাওয়া যায়। বিক্রেতা আসলেই জমির মালিক কিনা, তার নামে নামজারি (Mutation) আছে কিনা, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য এই মধ্যবর্তী সময়টি গুরুত্বপূর্ণ। চুক্তিপত্র থাকলে বিক্রেতা চাইলেই হুট করে অন্য কারো কাছে জমি বিক্রি করতে পারেন না।

২. প্রতারণা প্রতিরোধ

বাংলাদেশে একই জমি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করার প্রতারণা অহরহ ঘটে। একটি রেজিস্টার্ড বায়নানামা থাকলে, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ওই জমির বিপরীতে একটি ‘এনকামব্রেন্স’ (Encumbrance) বা দায় তৈরি হয়। ফলে বিক্রেতা গোপনে অন্য কারো কাছে জমিটি বিক্রি করতে গেলে ধরা পড়ে যাবেন।

৩. পরবর্তী বিরোধ নিষ্পত্তির ভিত্তি

ভবিষ্যতে যদি বিক্রেতা জমি লিখে দিতে অস্বীকার করেন অথবা ক্রেতা টাকা দিতে টালবাহানা করেন, তবে এই চুক্তিপত্রই আদালতের একমাত্র প্রমাণ। সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন (Specific Relief Act, 1877) এর অধীনে মামলা করে জমি রেজিস্ট্রি করে নেওয়ার বা ক্ষতিপূরণ আদায়ের একমাত্র হাতিয়ার হলো এই দলিল।

৪. ব্যাংক লোন / মিউটেশন / প্রসেসিং

আপনি যদি জমি বা ফ্ল্যাট কেনার জন্য ব্যাংক লোনের আবেদন করেন, তবে ব্যাংক প্রথমেই ‘বায়নানামা’ দেখতে চাইবে। ব্যাংক নিশ্চিত হতে চায় যে আপনি আসলেই প্রপার্টিটি কিনছেন এবং বিক্রেতার সাথে আপনার একটি বৈধ চুক্তি হয়েছে।

চুক্তিপত্রে প্রয়োজনীয় মূল উপাদান

একটি নিখুঁত চুক্তিপত্রে কিছু নির্দিষ্ট তথ্য (Attributes) থাকতেই হবে। এগুলোকে আমরা Entity-Attribute-Value (EAV) মডেলে ভাগ করে আলোচনা করতে পারি, যাতে কোনো পয়েন্ট বাদ না পড়ে।

১. পক্ষদ্বয়ের তথ্য

চুক্তিতে দুটি পক্ষ থাকে: ১ম পক্ষ (বিক্রেতা) এবং ২য় পক্ষ (ক্রেতা)। উভয়ের পরিচিতি নির্ভুল হতে হবে।

  • নাম: জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) অনুযায়ী পূর্ণ নাম।
  • পিতা/স্বামীর নাম: বংশপরিচয় নিশ্চিত করার জন্য জরুরি।
  • মাতা: আইনি বাধ্যবাধকতায় মায়ের নাম উল্লেখ করা হয়।
  • জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর (NID): এটি এখন বাধ্যতামূলক। এনআইডি না থাকলে পাসপোর্ট বা জন্ম নিবন্ধন ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে এনআইডি সর্বোৎকৃষ্ট।
  • ঠিকানা: বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা (পোস্ট কোডসহ)।
  • পেশা ও ধর্ম: পরিচিতির সুবিধার্থে।

টিপস: যদি বিক্রেতা কোনো কোম্পানি হয় (যেমন ডেভেলপার), তবে কোম্পানির নাম, রেজিস্ট্রেশন নম্বর এবং কোম্পানির পক্ষে স্বাক্ষরকারী ব্যক্তির (Managing Director/Authorized Person) নাম ও পদবি থাকতে হবে।

২. সম্পত্তির বিবরণ

চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘তফশিল’ বা Schedule of Property। এখানে সামান্য ভুল হলে পুরো টাকাই জলে যেতে পারে।

  • মৌজা (Mouza) ও জে.এল নম্বর: জমিটি কোন মৌজায় অবস্থিত।
  • খতিয়ান নম্বর: সিএস (CS), এসএ (SA), আরএস (RS), বিএস (BS) বা সিটি জরিপ খতিয়ান নম্বর। নামজারি খতিয়ান নম্বরও উল্লেখ করতে হবে।
  • দাগ নম্বর: সাবেক দাগ এবং হাল দাগ—উভয়ই উল্লেখ করা উচিত।
  • জমির পরিমাণ: জমির সঠিক পরিমাণ (শতাংশ/ডেসিমেল, কাঠা, বিঘা বা অজুতাংশ এককে)। ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে স্কয়ার ফিট।
  • চৌহদ্দি (Boundary): জমির উত্তরে, দক্ষিণে, পূর্বে এবং পশ্চিমে কার জমি বা রাস্তা আছে, তার বিবরণ। এটি জমি চিহ্নিত করতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে।
  • সম্পত্তির ধরন: এটি কি নাল জমি, ভিটি, বাড়ি, নাকি ফ্ল্যাট—তা স্পষ্ট করতে হবে।
  • অন্যান্য: ফ্ল্যাট হলে ফ্লোর নম্বর, কার পার্কিং আছে কিনা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগের অবস্থা (Utility connections)।

৩. মূল্য ও পরিশোধ পদ্ধতি

টাকা নিয়েই যত বিবাদ হয়, তাই এই অংশটি পানির মতো পরিষ্কার হতে হবে।

  • মোট মূল্য (Total Consideration Value): জমি বা ফ্ল্যাটের মোট দাম কত সাব্যস্ত হলো।
  • বায়না বা অগ্রিম (Earnest Money/Advance): চুক্তির সময় কত টাকা নগদ বা চেকে দেওয়া হলো। টাকার অংক কথায় ও সংখ্যায় লিখতে হবে।
  • কিস্তি সুবিধা (Installment Terms): বাকি টাকা কতগুলো কিস্তিতে পরিশোধ করা হবে।
  • পেমেন্ট মেথড: টাকা কি ক্যাশ দেওয়া হবে, নাকি পে-অর্ডার/চেক/ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে। ব্যাংক ডিটেইলস উল্লেখ করা নিরাপদ।
  • পরিশোধের সময়সীমা (Deadline): অবশিষ্ট টাকা পরিশোধের শেষ তারিখ কবে।

৪. দখল হস্তান্তরের শর্ত

টাকা দেওয়ার পর জমি বা ফ্ল্যাটের চাবি কখন হাতে পাবেন?

  • দখল তারিখ: সাফ কবলা রেজিস্ট্রির দিনই দখল দেওয়া হবে, নাকি আগেই দেওয়া হবে? সাধারণত পূর্ণ টাকা পরিশোধের পরই দখল দেওয়া হয়।
  • রেজিস্ট্রেশনের আগে দখল: অনেক সময় বায়নানামা করার পর ক্রেতা জমিতে বাউন্ডারি ওয়াল দিতে চান। এটি চুক্তিতে উল্লেখ থাকতে হবে।
  • বিরোধ নিষ্পত্তি (Dispute Rules): যদি হস্তান্তরের সময় দেখা যায় জমির মাপে কম আছে, তবে কী হবে? সাধারণত মাপে কম হলে আনুপাতিক হারে টাকা ফেরত বা সমন্বয় করার শর্ত থাকে।

৫. আইনি নথি ও মালিকানা যাচাইকরণ

চুক্তিপত্রে উল্লেখ থাকতে হবে যে বিক্রেতা মালিকানা প্রমাণের সব দলিল ক্রেতাকে দেখিয়েছেন এবং ক্রেতা তা যাচাই করে সন্তুষ্ট হয়েছেন।

  • ধারাবাহিক খতিয়ান: CS থেকে বর্তমান জরিপ পর্যন্ত মালিকানার ধারাবাহিকতা।
  • ভায়া দলিল (Chain of Deeds): বিক্রেতা কীভাবে মালিক হলেন (ক্রয়/উত্তরাধিকার/হেবা) তার প্রমাণ।
  • নামজারি (Mutation): বিক্রেতার নিজ নামে বর্তমান নামজারি খতিয়ান ও ডিসিআর (DCR)।
  • খাজনা দাখিলা (Rent Receipt): হাল সনের ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের রশিদ।
  • দায়মুক্তি সনদ (NEC): জমিটি ব্যাংকে মর্টগেজ বা অন্য কোথাও দায়বদ্ধ নয়, এই মর্মে ঘোষণা।

৬. চুক্তির মেয়াদ ও বাতিলের শর্ত

একটি বায়নানামা চিরস্থায়ী হয় না। এর একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে।

  • চুক্তির বৈধতা (Validity): সাধারণত ৩ মাস থেকে ৬ মাস সময় নেওয়া হয়। এর মধ্যে সাব-কবলা রেজিস্ট্রি করতে হয়। তবে উভয় পক্ষের সম্মতিতে এই মেয়াদ বাড়ানো যায়।
  • বাতিলের নিয়ম (Cancellation Rules):
    • ক্রেতার ব্যর্থতা: নির্দিষ্ট সময়ে ক্রেতা বাকি টাকা দিতে না পারলে বায়নার টাকা বাজেয়াপ্ত (Forfeit) হবে কিনা।
    • বিক্রেতার ব্যর্থতা: বিক্রেতা জমি দিতে ব্যর্থ হলে বা আইনি ত্রুটি থাকলে, বায়নার টাকা দ্বিগুণ বা সুদসহ ফেরত দিতে হবে কিনা।
  • রিফান্ড পলিসি: কোনো অনিবার্য কারণে চুক্তি বাতিল হলে টাকা ফেরতের সময়সীমা।

৭. দায়-দায়িত্ব

  • বিক্রেতার দায়িত্ব: বকেয়া বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি বিল এবং ভূমির খাজনা রেজিস্ট্রির আগেই পরিশোধ করা।
  • ক্রেতার দায়িত্ব: রেজিস্ট্রেশনের খরচ (স্ট্যাম্প ডিউটি, ফি, ট্যাক্স) বহন করা। বাংলাদেশে প্রথা অনুযায়ী ক্রেতাই রেজিস্ট্রেশন খরচ বহন করেন, তবে চুক্তিতে অন্যরূপ লেখা থাকলে সেটাই গণ্য হবে।

জমি–বাড়ি চুক্তিপত্র তৈরির ধাপ

একটি আইনসিদ্ধ চুক্তিপত্র তৈরির ধাপে ধাপে প্রক্রিয়াটি নিচে দেওয়া হলো:

  1. খসড়া তৈরি (Drafting): প্রথমে একজন অভিজ্ঞ দলিল লেখক (Deed Writer) বা আইনজীবীর মাধ্যমে সাদা কাগজে চুক্তির শর্তগুলো লিখুন। উভয় পক্ষ পড়ে দেখুন এবং কোনো সংশোধন থাকলে তা ঠিক করুন।
  2. নথি যাচাই (Due Diligence): খসড়া চূড়ান্ত করার আগে জমির সব কাগজ (খতিয়ান, দলিল, নামজারি) যাচাই করুন। প্রয়োজনে স্থানীয় ভূমি অফিসে গিয়ে তল্লাশি দিন।
  3. স্ট্যাম্প পেপার সংগ্রহ: বর্তমানে বায়নানামার জন্য ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ব্যবহার করা হয় (তবে টাকার অংকের ওপর ভিত্তি করে স্ট্যাম্প ডিউটি পরিবর্তিত হতে পারে, যা নিচে বিস্তারিত বলা আছে)। সাধারণত ৩টি ১০০ টাকার স্ট্যাম্পে দলিল প্রিন্ট করা হয়।
  4. প্রিন্টিং ও স্বাক্ষর: খসড়াটি স্ট্যাম্পে প্রিন্ট করে উভয় পক্ষ এবং অন্তত দুইজন সাক্ষী স্বাক্ষর করবেন। স্বাক্ষরের নিচে টিপসই দেওয়াও ভালো।
  5. রেজিস্ট্রেশন: স্বাক্ষর করার পর ৩০ দিনের মধ্যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে দলিলটি রেজিস্ট্রি করতে হবে। এখানে সরকার নির্ধারিত ফি জমা দিতে হয়।

কোন নথি যাচাই করা বাধ্যতামূলক?

জমি কেনার আগে “কাগজ যার, জমি তার” – এই নীতি মনে রাখবেন। নিচের নথিগুলো যাচাই করা বাধ্যতামূলক:

  • CS, SA, RS, BS খতিয়ান: সিএস (Cadastral Survey) হলো ব্রিটিশ আমলের, এসএ (State Acquisition) পাকিস্তান আমলের, আরএস (Revisional Survey) এবং বিএস/সিটি জরিপ হলো বাংলাদেশ আমলের। মালিকানার চেইন বা ধারাবাহিকতা ঠিক আছে কিনা দেখুন। মাঝখানের কোনো মালিক বাদ পড়লে সমস্যা হতে পারে।
  • নামজারি (Mutation): সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিক্রেতার নামে আলাদা খতিয়ান (নামজারি) খোলা হয়েছে কিনা দেখুন। নামজারি না থাকলে তিনি বৈধভাবে জমি বিক্রি করতে পারেন না।
  • মৌজা ম্যাপ: দলিলে যে দাগ নম্বর আছে, তা নকশায় (Map) সঠিক জায়গায় আছে কিনা এবং বাস্তবে জমির পরিমাণ নকশার সাথে মেলে কিনা, তা আমিন (Surveyor) দিয়ে মাপিয়ে নিন।
  • এনইসি (NEC): সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে Non-Encumbrance Certificate বা দায়মুক্তি সনদ তুলে দেখুন জমিটি গত ১২-২৫ বছরে অন্য কারো কাছে বিক্রি বা বন্ধক দেওয়া হয়েছে কিনা।

জমি কেনা-বেচায় সাধারণ প্রতারণা

সতর্ক না হলে নিচের ফাঁদগুলোতে পা দিতে পারেন:

  1. ডুপ্লিকেট খতিয়ান: কম্পিউটারে তৈরি নকল খতিয়ান বা পরচা দেখিয়ে জমি বিক্রি। (প্রতিকার: ভূমি অফিসে গিয়ে ভলিউম বই চেক করা)।
  2. ভুয়া বিক্রেতা: প্রকৃত মালিক বিদেশে থাকেন, কিন্তু অন্য কেউ মালিক সেজে জমি বিক্রি করছে। (প্রতিকার: এনআইডি এবং এলাকায় খোঁজ নেওয়া)।
  3. আমমোক্তারনামা (Power of Attorney) প্রতারণা: ভুয়া পাওয়ার অব এটর্নি দলিল দিয়ে জমি বিক্রি। (প্রতিকার: পাওয়ার অব এটর্নি দলিলটি রেজিস্ট্রি অফিস থেকে যাচাই করা)।
  4. খাস জমি বিক্রি: সরকারি খাস জমি বা অর্পিত সম্পত্তি (Vested Property) ব্যক্তিমালিকানাধীন বলে বিক্রি করা।
  5. বাউন্ডারি বিরোধ: দলিলে ৫ কাঠা লেখা থাকলেও বাস্তবে দখলে আছে ৪ কাঠা।

Buyer–Seller বিরোধের মূল কারণ

চুক্তি হওয়ার পরেও কেন বিবাদ হয়?

  • দখল বুঝিয়ে না দেওয়া: টাকা নেওয়ার পর বিক্রেতা দখল ছাড়তে চান না।
  • বাড়তি টাকা দাবি: জমির দাম বেড়ে গেলে বিক্রেতা চুক্তির মূল্যের চেয়ে বেশি দাবি করেন।
  • দলিলের অমিল: বায়নানামায় যে দাগ নম্বর লেখা হয়েছে, সাফ কবালায় ভুলে অন্য দাগ নম্বর উঠলে।
  • গোপন ঋণ: বিক্রির পর জানা গেল জমিটি ব্যাংকে মর্টগেজ দেওয়া।

কোন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত?

  • দেওয়ানি আইনজীবী (Civil Lawyer): দলিলের আইনি ভাষা এবং শর্তাবলী ঠিক করার জন্য।
  • সার্ভেয়ার বা আমিন: জমি মেপে সীমানা ঠিক করার জন্য।
  • দলিল লেখক (Deed Writer): সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নিয়ম মেনে দলিল টাইপ করার জন্য।
  • সাব-রেজিস্ট্রার অফিস: তল্লাশি বা সার্চিং দেয়ার জন্য।

ক্রয়-বিক্রয় চুক্তিপত্রের সম্পূর্ণ নমুনা

নিচে একটি আদর্শ বায়নাপত্র দলিলের নমুনা দেওয়া হলো। এটি এডিট করে ব্যবহার করা যাবে।

১ম পক্ষ (বিক্রেতা):

নাম: …………………………………………….পিতা: …………………………………………….মাতা: …………………………………………….সাংঃ …………………………………………..এনআইডি: …………………………………………

২য় পক্ষ (ক্রেতা):

নাম: …………………………………………….পিতা: …………………………………………….মাতা: …………………………………………….সাং: …………………………………………..এনআইডি: …………………………………………

সম্পত্তির তফসিল:

জেলা: ………………., থানা: ………………., মৌজা: ……………….জে.এল নং: ………………., খতিয়ান নং (আরএস/বিএস): ……………….দাগ নং: ………………., জমির পরিমাণ: ………………. শতাংশ/কাঠা।চৌহদ্দি: উত্তরে-…………, দক্ষিণে-…………, পূর্বে-…………, পশ্চিমে-…………।

শর্তাবলী:

১. অদ্য ………………. তারিখে অত্র বায়না দলিল মূলে উপরোক্ত তফসিল বর্ণিত সম্পত্তি মোট ………………. (কথায়) টাকা মূল্যে বিক্রয়ের জন্য সাব্যস্ত হলো।

২. অদ্য বায়না বাবদ ১ম পক্ষ, ২য় পক্ষের নিকট হতে নগদ/চেক নং ………………. এর মাধ্যমে ………………. (কথায়) টাকা গ্রহণ করলেন।

৩. অবশিষ্ট ………………. (কথায়) টাকা আগামী ………………. তারিখের মধ্যে পরিশোধ করে ২য় পক্ষ সাফ কবলা দলিল রেজিস্ট্রি করে নিবেন।

৪. ১ম পক্ষ বর্ণিত সম্পত্তি সম্পূর্ণ নির্দায়ী ও নিষ্কণ্টক অবস্থায় ২য় পক্ষের বরাবর হস্তান্তর করবেন। এই জমিতে অন্য কারো স্বত্ব বা অধিকার নেই।

৫. নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ২য় পক্ষ বাকি টাকা দিতে ব্যর্থ হলে, বায়নার টাকা বাজেয়াপ্ত বলে গণ্য হবে (অথবা আলোচনার মাধ্যমে সময় বৃদ্ধি করা যাবে)।

৬. নির্ধারিত সময়ে ১ম পক্ষ দলিল রেজিস্ট্রি করে দিতে ব্যর্থ হলে, তিনি বায়নার টাকার দ্বিগুণ অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য থাকবেন এবং ২য় পক্ষ আদালতের মাধ্যমে দলিল রেজিস্ট্রি করে নেওয়ার অধিকারী হবেন।

৭. এই সম্পত্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত যাবতীয় খরচ (রেজিস্ট্রেশন ফি, স্ট্যাম্প ডিউটি) ২য় পক্ষ (ক্রেতা) বহন করবেন।

স্বাক্ষর:

____________________ (১ম পক্ষ/বিক্রেতা)

____________________ (২য় পক্ষ/ক্রেতা)

সাক্ষীগণের স্বাক্ষর:

১. ____________________

২. ____________________

৩. ____________________

জমি কেনার আগে যাচাই–বাছাই চেকলিস্ট (Checklist)

জমি বা ফ্ল্যাট কেনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিচের চেকলিস্টটি মিলিয়ে নিন:

  •  বিক্রেতার এনআইডি আসল কিনা যাচাই করেছেন?
  • জমির সিএস, এসএ, আরএস, বিএস পর্চা (খতিয়ান) চেক করেছেন?
  • নামজারি (Mutation) খতিয়ান বিক্রেতার নামে আছে কিনা?
  • হাল সনের ভূমি উন্নয়ন কর (Land Tax) পরিশোধিত আছে কিনা?
  • জমিটি সরেজমিনে (Physically) ভিজিট করেছেন?
  • আশেপাশের মানুষের কাছে মালিকানা নিয়ে কথা বলেছেন?
  • জমিটি কোনো সরকারি প্রজেক্ট বা অধিগ্রহণের মধ্যে পড়েছে কিনা?
  • সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে তল্লাশি (Search) দিয়েছেন?
  • একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী দিয়ে সব কাগজ ভেটিং করিয়েছেন?

বাড়ির রেজিস্ট্রি করার নিয়ম

ফ্ল্যাট বা বাড়ি রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে জমির দলিলের পাশাপাশি আরও কিছু কাগজ লাগে। যেমন- রাজউকের (বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের) অনুমোদিত নকশা (Plan), অকুপেন্সি সার্টিফিকেট। ফ্ল্যাট কেনার সময় আনুপাতিক হারে জমির মালিকানাও (Undivided Share of Land) আপনার নামে রেজিস্ট্রি হচ্ছে কিনা তা খেয়াল রাখতে হবে।

স্ট্যাম্প ডিউটি ও রেজিস্ট্রেশন ফি কত হয়?

২০২৪-২৫ অর্থবছর অনুযায়ী রেজিস্ট্রেশন খরচ কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে, তবে সাধারণ ধারণা হলো:

  • রেজিস্ট্রেশন ফি: দলিলের মূল্যের ১%।
  • স্ট্যাম্প ডিউটি: দলিলের মূল্যের ১.৫% – ৩% (এলাকা ভেদে)।
  • স্থানীয় সরকার কর: ২% – ৩%।
  • উৎস কর (Gain Tax): এলাকা ভেদে ৪% থেকে ৮% পর্যন্ত হতে পারে (বিক্রেতা দেয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে ক্রেতা দেয়)।
  • ভ্যাট (VAT): ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে ১.৫% থেকে ৪.৫% (সাইজ অনুযায়ী)।
  • দ্রষ্টব্য: মোট খরচ সম্পত্তির মূল্যের প্রায় ১০%-১২% পর্যন্ত হতে পারে।

দখল–কবলা–মিউটেশন—এগুলোর পার্থক্য কী?

  • দখল (Possession): জমিতে শারীরিকভাবে অবস্থান করা বা ব্যবহার করা।
  • কবলা (Deed): সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে দেওয়া মালিকানার মূল দলিল। এটি মালিকানার আইনি প্রমাণ।
  • মিউটেশন (Mutation): সরকারি রাজস্ব অফিসে (তহশিল অফিস) পুরনো মালিকের নাম কেটে নতুন মালিক (আপনার) নাম তোলা। এটি ছাড়া আপনি খাজনা দিতে পারবেন না এবং সরকার আপনাকে মালিক হিসেবে চিনবে না।

ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শর্ত

ডেভেলপারের কাছ থেকে ফ্ল্যাট কিনলে বায়নানামায় নিচের বিষয়গুলো অবশ্যই থাকতে হবে:

  • হস্তান্তরের তারিখ (Handover date)।
  • বিলম্ব হলে ক্ষতিপূরণ (Delay penalty)।
  • ব্যবহৃত ফিটিংস (টাইলস, লিফট, জেনারেটর) এর ব্র্যান্ড ও স্পেসিফিকেশন।
  • কমন স্পেসের পরিমাপ।

Developer/Broker থাকলে কীভাবে নিরাপদ থাকা যায়

ব্রোকার বা মধ্যস্ততাকারী থাকলে কখনই তাদের হাতে নগদ টাকা দেবেন না। সব লেনদেন সরাসরি জমির মালিকের সাথে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে করুন। ডেভেলপারের ক্ষেত্রে তাদের রিহ্যাব (REHAB) মেম্বারশিপ আছে কিনা এবং রাজউকের অনুমোদন আছে কিনা যাচাই করুন।

উপসংহার

একটি সঠিক ও নিশ্ছিদ্র জমি–বাড়ি ক্রয়-বিক্রয় চুক্তিপত্র আপনাকে ভবিষ্যতের হাজারো আইনি ঝামেলা থেকে বাঁচাতে পারে। ২০০ টাকার স্ট্যাম্প বাঁচানোর জন্য বা আইনজীবীর ফি বাঁচানোর জন্য ঝুঁকি নেবেন না। মনে রাখবেন, আজকের সামান্য সতর্কতা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ সম্পদ নিশ্চিত করবে।

এই লেখাটি শুধুমাত্র তথ্যের জন্য। আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আগে অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top