বাংলাদেশে জমি বা ফ্ল্যাট কেনা-বেচার ক্ষেত্রে সাব কবলা দলিল (Sub-Kabla Deed) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি নথি। এটি মূলত মূল মালিকের কাছ থেকে পরবর্তী ক্রেতার নামে মালিকানা হস্তান্তরের দলিল। অর্থাৎ, এটি “বিক্রয় দলিলের” একটি পরবর্তী ধাপ — যেখানে আগের মালিকের ক্রয়কৃত সম্পত্তি নতুন ক্রেতার নামে স্থানান্তরিত হয়।
এই আর্টিকেলে আমরা সহজ ভাষায় আলোচনা করব সাব কবলা দলিল লেখার নিয়ম, প্রয়োজনীয় তথ্য, আইনি ধাপ, ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপস যা আপনাকে পুরো প্রক্রিয়াটি বুঝতে সহায়তা করবে।

সাব কবলা দলিল কী?
সাব কবলা দলিল হলো এমন একটি দলিল যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি পূর্বে ক্রয়কৃত সম্পত্তি (জমি, ফ্ল্যাট বা বাড়ি) অন্য কারও কাছে বিক্রি বা হস্তান্তর করে। এটি “কবলা দলিল”-এর মতোই একটি বিক্রয় দলিল, তবে পার্থক্য হলো এটি “মূল ক্রেতা”-র পরিবর্তে “পরবর্তী ক্রেতা”-র নামে তৈরি হয়।
সাব কবলা দলিল লেখার ধাপসমূহ
নিচে ধাপে ধাপে সাব কবলা দলিল লেখার নিয়ম তুলে ধরা হলো, যা আপনার দেওয়া মূল নথির কাঠামোর (সাফ কবলা দলিল) উপর ভিত্তি করে তৈরি:
ধাপ ১: দলিলের পরিচিতি অংশ তৈরি
দলিলের শুরুতে থাকতে হবে নিম্নলিখিত তথ্য:
- দলিল নম্বর ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর
- দলিলের তারিখ
- সম্পত্তির অবস্থান (থানা, জেলা, মৌজা, হোল্ডিং নম্বর ইত্যাদি)
- সাফ কবলা (Sub-Kabla) শিরোনাম
ধাপ ২: সম্পত্তির বিবরণ
এখানে সম্পত্তির ধরন, আয়তন, সীমানা, প্লট নম্বর, রাস্তার নাম ইত্যাদি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করতে হবে।
উদাহরণ:
“… ৩ কাঠা জমির উপর নির্মিত ১২০০ বর্গফুটের আবাসিক ফ্ল্যাট, যা রোড নং ৭, সেকশন ১০, মিরপুর, ঢাকা-১২১৬-এ অবস্থিত।”
ধাপ ৩: ক্রেতা ও বিক্রেতার তথ্য
উভয় পক্ষের নাম, পিতা/স্বামীর নাম, ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও পেশা উল্লেখ করতে হবে।
সাথে তাদের স্বাক্ষর ও পাসপোর্ট সাইজ ছবি যুক্ত করা বাধ্যতামূলক।
ধাপ ৪: মূল্য ও পরিশোধ সংক্রান্ত বিবরণ
এখানে সম্পত্তির মোট মূল্য, মূল্য পরিশোধের পদ্ধতি ও সময় উল্লেখ করা হয়।
উদাহরণ:
“মোট মূল্য ৫০,০০,০০০ (পঞ্চাশ লক্ষ) টাকা, যা বিক্রেতা সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করেছেন।”
ধাপ ৫: দলিলের ইতিহাস ও উৎস
এটি দলিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এখানে উল্লেখ করতে হবে:
- সম্পত্তিটি কার কাছ থেকে ক্রয় করা হয়েছিল
- আগের দলিলের নম্বর, তারিখ, ও রেজিস্ট্রেশন অফিস
- দখল ও মালিকানা হস্তান্তরের প্রমাণ
ধাপ ৬: ঘোষণা ও অঙ্গীকার
বিক্রেতা এখানে ঘোষণা করেন যে:
- সম্পত্তির উপর কোনো মামলা, ঋণ বা জটিলতা নেই
- তিনি বৈধ মালিক এবং সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় বিক্রয় করছেন
- ভবিষ্যতে কোনো দাবি তুলবেন না
ধাপ ৭: সাক্ষী ও সাইন করা
দলিলের শেষে দুইজন সাক্ষীর নাম, ঠিকানা ও স্বাক্ষর দিতে হয়।
এরপর ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ে দলিলে স্বাক্ষর করেন এবং রেজিস্ট্রার অফিসে উপস্থিত হয়ে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করেন।
সাব কবলা দলিলের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
দলিল লেখার আগে নিম্নলিখিত নথি প্রস্তুত রাখতে হবে:
- আগের মূল কবলা দলিলের কপি
- খাজনা রশিদ ও মিউটেশনের কপি
- ক্রেতা ও বিক্রেতার এনআইডি
- ট্যাক্স ও পৌরসভার অনুমতি পত্র (প্রয়োজনে)
- দলিল লেখক বা নোটারির সনদ (যদি প্রয়োজন হয়)
দলিল লেখার সময় সাধারণ ভুল যা এড়ানো উচিত
- আগের দলিলের তথ্য ভুলভাবে লেখা
- প্লট বা জমির মাপ ভুলভাবে উল্লেখ করা
- সাক্ষীর নাম ও স্বাক্ষর অনুপস্থিত রাখা
- সরকারি ফি বা স্ট্যাম্প ডিউটি সঠিকভাবে পরিশোধ না করা
এই ভুলগুলো ভবিষ্যতে বড় আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে, তাই সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি।
উপসংহার
সাব কবলা দলিল হলো সম্পত্তি বিক্রয় প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ধাপ, যা ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের অধিকার রক্ষা করে। সঠিক তথ্য, আইন অনুযায়ী রেজিস্ট্রেশন, এবং সাক্ষ্য প্রমাণসহ দলিল তৈরি করলে ভবিষ্যতে কোনো ঝামেলায় পড়ার সম্ভাবনা থাকে না।
যদি আপনি নিজের সাব কবলা দলিল তৈরি করতে চান, তবে অভিজ্ঞ দলিল লেখক বা ল’ কনসালট্যান্টের সাহায্য নেওয়া বাঞ্ছনীয়।


