চুক্তিপত্র কী? নিয়ম, শর্ত ও বৈধতা

দৈনন্দিন জীবনে আমরা জেনে বা না জেনে অসংখ্য চুক্তির মধ্যে দিয়ে যাই। সকালে রিকশাওয়ালার সাথে গন্তব্যে যাওয়ার ভাড়া ঠিক করা থেকে শুরু করে, কোটি টাকার জমি কেনা বা ব্যবসায়িক পার্টনারশিপ—সবই চুক্তির আওতায় পড়ে। কিন্তু আইনের দৃষ্টিতে সব সম্মতি বা বোঝাপড়া কি ‘চুক্তি’? একটি সাধারণ সাদা কাগজে লেখা আপসনামা আর আইনি স্ট্যাম্পে লেখা চুক্তিপত্রের মধ্যে পার্থক্য কী?

বাংলাদেশে চুক্তি সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম ‘বাংলাদেশ চুক্তি আইন, ১৮৭২’ (The Contract Act, 1872) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। আপনি যদি একজন ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, বা সাধারণ সচেতন নাগরিক হন, তবে চুক্তিপত্রের আইনি খুঁটিনাটি জানা আপনার জন্য অত্যন্ত জরুরি। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা চুক্তিপত্রের সংজ্ঞা, বৈধতার শর্ত, উপাদান, প্রকারভেদ এবং আইনগত দিকগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

চুক্তিপত্র কী

চুক্তিপত্র কী?

সহজ কথায়, যখন দুই বা ততোধিক ব্যক্তি কোনো নির্দিষ্ট কাজ করা বা না করার বিষয়ে একমত হন এবং সেই সম্মতির পেছনে আইনের সমর্থন থাকে, তখন তাকে চুক্তি (Contract) বলা হয়।

তবে আইনের ভাষায় এর সংজ্ঞাটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। বাংলাদেশ চুক্তি আইন ১৮৭২-এর ২(জ) ধারা (Section 2h) অনুযায়ী:

“আইন দ্বারা বলবৎযোগ্য সম্মতিই হলো চুক্তি।” (An agreement enforceable by law is a contract.)

এখানে দুটি প্রধান উপাদান লক্ষ্যণীয়:

১. সম্মতি (Agreement): দুই পক্ষের একই বিষয়ে একমত হওয়া।

২. আইনি বলবৎযোগ্যতা (Legal Enforceability): অর্থাৎ, কেউ কথা না রাখলে আদালতের মাধ্যমে তা আদায় করার সুযোগ থাকা।

চুক্তি (Contract) বনাম সম্মতি (Agreement): পার্থক্য কী?

অনেকেই ‘চুক্তি’ এবং ‘সম্মতি’ বা ‘এগ্রিমেন্ট’ কে এক মনে করেন। কিন্তু এদের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। একটি বিখ্যাত আইনি প্রবাদ আছে:

“সকল চুক্তিই সম্মতি, কিন্তু সকল সম্মতি চুক্তি নয়।”

উদাহরণ:

  • আপনি বন্ধুকে দাওয়াত দিলেন এবং সে আসতে রাজি হলো। এটি একটি সামাজিক সম্মতি (Social Agreement)। বন্ধু না আসলে আপনি তার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবেন না। তাই এটি চুক্তি নয়।
  • আপনি কারো কাছে ১০ হাজার টাকায় ল্যাপটপ বিক্রির প্রস্তাব দিলেন এবং সে রাজি হলো। এখানে টাকার বিনিময়ে পণ্য হস্তান্তর হচ্ছে এবং এটি আইনত বৈধ। তাই এটি একটি চুক্তি (Contract)

চুক্তিপত্র বৈধ হওয়ার মৌলিক শর্তসমূহ

একটি সাদা কাগজে সই করলেই তা চুক্তি হয়ে যায় না। চুক্তি আইনের ১০ নম্বর ধারা (Section 10) অনুযায়ী, একটি সম্মতিকে ‘চুক্তি’ বা Contract হিসেবে গণ্য হতে হলে কিছু মৌলিক উপাদান অবশ্যই থাকতে হবে। এর কোনো একটি অনুপস্থিত থাকলে চুক্তিটি বাতিল (Void) বা অবৈধ বলে গণ্য হতে পারে।

নিচে বৈধ চুক্তির অপরিহার্য উপাদানগুলো আলোচনা করা হলো:

১। প্রস্তাব ও গ্রহণ (Offer and Acceptance)

চুক্তির সূচনা হয় একটি প্রস্তাব (Offer) এর মাধ্যমে। এক পক্ষ প্রস্তাব দেবে এবং অন্য পক্ষ তা কোনো শর্ত ছাড়াই গ্রহণ (Acceptance) করবে।

  • প্রস্তাবটি সুনির্দিষ্ট হতে হবে।
  • গ্রহণ বা সম্মতিটি নিঃশর্ত (Unconditional) হতে হবে। যদি কেউ বলে, “আমি কিনব, তবে দাম কমাতে হবে”—তবে সেটি গ্রহণ নয়, বরং পাল্টা প্রস্তাব (Counter Offer)।

২। আইনসম্মত সম্পর্ক স্থাপনের ইচ্ছা (Intention to create legal relationship)

চুক্তি করার সময় উভয় পক্ষের উদ্দেশ্য হতে হবে যে, কেউ কথা না রাখলে আইনের আশ্রয় নেওয়া যাবে। পারিবারিক বা ঠাট্টাচ্ছলে করা কোনো ওয়াদা চুক্তি হিসেবে গণ্য হয় না।

৩। প্রতিদান (Consideration)

আইনের ভাষায় একটি কথা আছে—”বিনিময় ছাড়া চুক্তি হয় না” (No consideration, no contract)।

এক পক্ষের দেওয়ার বিপরীতে অন্য পক্ষের কিছু পাওয়ার নামই প্রতিদান। এটি টাকা, সেবা, বা কোনো দ্রব্যের বিনিময় হতে পারে।

  • উদাহরণ: আপনি বাড়িভাড়া নিচ্ছেন। এখানে আপনার প্রতিদান হলো ‘টাকা’ এবং বাড়িওয়ালার প্রতিদান হলো আপনাকে ‘থাকতে দেওয়ার সুবিধা’।

৪। পক্ষগণের যোগ্যতা (Capacity of Parties)

চুক্তি আইনের ১১ ধারা অনুযায়ী, সব মানুষ চুক্তি করার যোগ্য নন। চুক্তি করতে হলে ব্যক্তিকে অবশ্যই:

১. সাবালক হতে হবে: বাংলাদেশে ১৮ বছরের কম বয়সী (নাবালক) কারো সাথে করা চুক্তি বাতিল বলে গণ্য হয়।

২. সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হতে হবে: পাগল বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি চুক্তি করতে পারে না।

৩. আইন দ্বারা অযোগ্য ঘোষিত নন: দেউলিয়া বা ফেরারি আসামির সাথে নির্দিষ্ট কিছু চুক্তি করা যায় না।

৫। স্বাধীন সম্মতি (Free Consent)

চুক্তিতে সই করার সময় উভয় পক্ষের সম্মতি সম্পূর্ণ স্বাধীন হতে হবে। নিচের কোনো উপায়ে সম্মতি নেওয়া হলে তা স্বাধীন সম্মতি নয়:

  • বলপ্রয়োগ (Coercion): ভয় দেখিয়ে বা মারধর করে।
  • অনুচিত প্রভাব (Undue Influence): পদের অপব্যবহার করে (যেমন: ডাক্তার-রোগী বা শিক্ষক-ছাত্র)।
  • প্রতারণা (Fraud): মিথ্যা তথ্য দিয়ে।
  • ভুল (Mistake): বিষয়বস্তু সম্পর্কে ভুল ধারণা থাকা।

৬। বৈধ উদ্দেশ্য (Lawful Object)

চুক্তির উদ্দেশ্য অবশ্যই আইনসম্মত হতে হবে। যেমন, কাউকে মারধর করার জন্য সুপারি দেওয়ার চুক্তি বা নিষিদ্ধ মাদক পাচারের চুক্তি আইনের দৃষ্টিতে শুরু থেকেই বাতিল (Void ab initio)।

জেনে নিনঃচুক্তি ভঙ্গের প্রতিকার: আইনি অধিকার

বাংলাদেশে চুক্তিপত্র কোন আইনে নিয়ন্ত্রিত হয়?

বাংলাদেশে চুক্তি সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় ‘দ্য কন্ট্রাক্ট অ্যাক্ট, ১৮৭২’ (The Contract Act, 1872) বা বাংলাদেশ চুক্তি আইন ১৮৭২ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এটি একটি দেওয়ানি আইন। যদিও এটি ব্রিটিশ আমলের তৈরি আইন, তবুও বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতে এটি মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

এই আইনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারা:

  • ধারা ২: প্রস্তাব, গ্রহণ, এবং চুক্তির সংজ্ঞা।
  • ধারা ১০: কোন কোন সম্মতি চুক্তি বলে গণ্য হবে।
  • ধারা ১১: কারা চুক্তি করতে সক্ষম।
  • ধারা ২৩: কোন উদ্দেশ্যগুলো অবৈধ বা অনৈতিক।
  • ধারা ৭৩: চুক্তি ভঙ্গের জন্য ক্ষতিপূরণ।

এছাড়াও, নির্দিষ্ট কিছু চুক্তির ক্ষেত্রে (যেমন জমি কেনাবেচা) রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮ (Registration Act 1908) এবং সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২ এর বিধানও প্রযোজ্য হয়।

চুক্তিপত্রের ধরন (Types of Contracts)

চুক্তি সবসময় একই ধরনের হয় না। গঠন এবং কার্যকারিতার ওপর ভিত্তি করে চুক্তিকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়:

১. লিখিত ও মৌখিক চুক্তি (Written vs. Oral Contract)

  • লিখিত চুক্তি: এটি স্ট্যাম্প পেপারে লিখিত থাকে। প্রমাণ হিসেবে এটি সবচেয়ে শক্তিশালী।
  • মৌখিক চুক্তি: মুখে মুখে যে সম্মতি হয়। আইনের দৃষ্টিতে মৌখিক চুক্তি বৈধ হলেও, আদালতে প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন। তাই গুরুত্বপূর্ণ লেনদেনে সর্বদা লিখিত চুক্তি করা উচিত।

২. প্রকাশ্য ও ইঙ্গিতপূর্ণ চুক্তি (Express vs. Implied Contract)

  • প্রকাশ্য চুক্তি: যখন শব্দ ব্যবহার করে (লিখে বা বলে) চুক্তি করা হয়।
  • ইঙ্গিতপূর্ণ চুক্তি: যখন আচরণের মাধ্যমে চুক্তি তৈরি হয়। যেমন: আপনি বাসে উঠলেন মানেই আপনি ভাড়া দিতে বাধ্য। এখানে আলাদা করে কন্টাক্টরের সাথে চুক্তি সই করতে হয় না।

৩. ই-কন্ট্রাক্ট (Digital/E-contract)

বর্তমান যুগে ইমেইল, হোয়াটসঅ্যাপ বা ওয়েবসাইটের ‘I Agree’ বাটনে ক্লিক করার মাধ্যমে যে চুক্তি হয়, তা ই-কন্ট্রাক্ট। বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন এবং সাক্ষ্য আইন অনুযায়ী এটিও বৈধ।

৪. বাতিল ও বাতিলযোগ্য চুক্তি (Void vs. Voidable)

  • Void Contract (বাতিল চুক্তি): যা আইনের দৃষ্টিতে শুরু থেকেই অস্তিত্বহীন (যেমন: নাবালকের সাথে চুক্তি)।
  • Voidable Contract (বাতিলযোগ্য চুক্তি): যা এক পক্ষের ইচ্ছায় বাতিল করা যায়। যেমন: কাউকে জোর করে ভয় দেখিয়ে জমি লিখিয়ে নিলে, ভুক্তভোগী চাইলে সেই চুক্তি বাতিল করতে পারেন।

সাধারণ চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ক্লজসমূহ (Important Clauses)

একটি ভালো চুক্তিপত্র বা ডিড (Deed) ড্রাফট করার সময় কিছু নির্দিষ্ট শর্ত বা ‘ক্লজ’ (Clause) অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। এগুলো ভবিষ্যতে বিবাদ এড়াতে সাহায্য করে।

১. লেনদেন বা পেমেন্ট ক্লজ (Payment Terms)

টাকা কীভাবে দেওয়া হবে? নগদে, চেকে নাকি ব্যাংক ট্রান্সফারে? কত তারিখের মধ্যে দিতে হবে? দেরি হলে কি কোনো জরিমানা আছে? এসব স্পষ্ট থাকতে হবে।

২. গোপনীয়তা রক্ষা (Confidentiality Clause)

ব্যবসায়িক চুক্তির ক্ষেত্রে এটি খুব জরুরি। এক পক্ষ অন্য পক্ষের গোপন ব্যবসায়িক তথ্য তৃতীয় কাউকে জানাতে পারবে না—এই শর্তটি এখানে থাকে।

৩. মেয়াদ ও সমাপ্তি (Termination Clause)

চুক্তিটি কত দিন বলবৎ থাকবে এবং মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে কোনো পক্ষ চুক্তি বাতিল করতে চাইলে কত দিন আগে নোটিশ দিতে হবে, তা এখানে লেখা থাকে।

৪. বিরোধ নিষ্পত্তি (Dispute Resolution/Arbitration)

ভবিষ্যতে যদি দুই পক্ষের মধ্যে ঝগড়া হয়, তবে তারা কি সরাসরি আদালতে যাবে নাকি আগে সালিশি (Arbitration) বা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করবে? এটি আগে থেকে ঠিক করে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।

৫. ফোর্স মেজ্যুর (Force Majeure)

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী (যেমন: করোনা), যুদ্ধ বা এমন কোনো পরিস্থিতির কারণে যদি কেউ চুক্তি পালন করতে না পারে, তবে তাকে দোষী করা যাবে না। এই রক্ষা কবচটিই হলো ফোর্স মেজ্যুর।

চুক্তিপত্র প্রস্তুত করার ধাপ (Step-by-step Drafting Guide)

আপনি যদি নিজে কোনো সাধারণ চুক্তিপত্র (যেমন: বাড়ি ভাড়া, দোকান ভাড়া বা পার্টনারশিপ) ড্রাফট করতে চান, তবে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে পারেন:

ধাপ ১: শিরোনাম (Title)

চুক্তিপত্রের শুরুতে একটি স্পষ্ট নাম দিতে হবে। যেমন: “বাড়ি ভাড়ার চুক্তিপত্র” বা “ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের চুক্তিপত্র”।

ধাপ ২: পক্ষগণের পরিচিতি (Identification of Parties)

প্রথম পক্ষ (মালিক/দাতা) এবং দ্বিতীয় পক্ষের (গ্রহীতা) নাম, পিতার নাম, ঠিকানা এবং জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর নির্ভুলভাবে লিখতে হবে।

ধাপ ৩: পটভূমি (Recitals)

কেন এই চুক্তিটি করা হচ্ছে তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ। সাধারণত “যেহেতু…” দিয়ে এই লাইনগুলো শুরু হয়।

ধাপ ৪: শর্তাবলী (Terms & Conditions)

এখানে মূল বিষয়গুলো পয়েন্ট আকারে লিখুন (ভাড়া কত, ডিউটি কী, দায়িত্ব কার কতটুকু)। ভাষা হতে হবে সহজ ও দ্ব্যর্থহীন।

ধাপ ৫: সাক্ষী (Witnesses)

অন্তত দুইজন নিরপেক্ষ সাক্ষীর নাম, ঠিকানা ও স্বাক্ষর থাকতে হবে। বিরোধের সময় সাক্ষীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ধাপ ৬: স্বাক্ষর ও তারিখ

চুক্তির প্রতিটি পৃষ্ঠায় এবং শেষে উভয় পক্ষের স্বাক্ষর থাকতে হবে। স্বাক্ষরের নিচে তারিখ উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক।

ধাপ ৭: স্ট্যাম্প ও নোটারি

চুক্তির ধরণ অনুযায়ী সঠিক মানের (যেমন: ৩০০ টাকা বা তার বেশি) নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে প্রিন্ট করতে হবে এবং প্রয়োজনে নোটারি বা রেজিস্ট্রি করতে হবে।

কোন কোন কারণে চুক্তি অবৈধ হতে পারে?

চুক্তি আইনে কিছু নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ আছে যা একটি চুক্তিকে অবৈধ বা বাতিল (Void) করে দেয়:

১. ভুল তথ্য বা প্রতারণা: কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে বা মিথ্যা বলে চুক্তি করলে তা টেকে না।

২. অসম্ভব কাজ: এমন কোনো কাজের চুক্তি করা যা বাস্তবে করা সম্ভব নয়। যেমন: “জাদু দিয়ে টাকা দ্বিগুণ করে দেব”—এমন চুক্তি অবৈধ।

৩. আইনবিরোধী: জুয়া খেলা, চোরাচালান বা কাউকে ক্ষতি করার চুক্তি।

৪. বিনা প্রতিদানে: আগেই বলা হয়েছে, বিনিময় ছাড়া চুক্তি সাধারণত অবৈধ (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, যেমন: দান বা স্নেহবশত উপহার)।

৫. বাণিজ্য বা বিয়েতে বাধা: প্রাপ্তবয়স্ক কাউকে বিয়ে করতে বাধা দেওয়া বা বৈধ ব্যবসা করতে বাধা দেওয়ার শর্ত থাকলে সেই চুক্তি বাতিল।

চুক্তি ভঙ্গ হলে কি হয়? (Breach Consequences)

যখন কোনো এক পক্ষ চুক্তির শর্ত পালন করতে ব্যর্থ হয় বা অস্বীকার করে, তখন তাকে চুক্তিভঙ্গ (Breach of Contract) বলা হয়। চুক্তিভঙ্গ হলে ভুক্তভোগী পক্ষ আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। প্রতিকারগুলো হলো:

  • ক্ষতিপূরণ (Damages): চুক্তিভঙ্গের কারণে অপর পক্ষের যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, আদালত তা পূরণ করার আদেশ দিতে পারেন।
  • সুনির্দিষ্ট প্রতিকার (Specific Performance): কিছু ক্ষেত্রে আদালত শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, বরং চুক্তি অনুযায়ী কাজটি সম্পন্ন করার নির্দেশ দেন (যেমন: জমির বায়না করার পর জমি রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার নির্দেশ)।
  • নিষেধাজ্ঞা (Injunction): কোনো কাজ করা থেকে বিরত থাকার আদেশ।
  • চুক্তি বাতিল (Rescission): অপর পক্ষ শর্ত না মানলে আপনিও আপনার দায়িত্ব পালন থেকে মুক্তি চাইতে পারেন।

চুক্তিপত্র কি নোটারি করতে হয়? (Notary vs Registration)

এটি একটি সাধারণ প্রশ্ন। সব চুক্তি কি নোটারি বা রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক?

  • নোটারি পাবলিক: নোটারি বা এফিডেভিট হলো একজন আইনজীবীর মাধ্যমে স্বাক্ষরের সত্যতা প্রতিপাদন করা। সাধারণ চুক্তি, হলফনামা বা ছোটখাটো লেনদেনে নোটারি যথেষ্ট হতে পারে। এটি দলিলের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়।
  • রেজিস্ট্রেশন: কিছু চুক্তি আইনের দ্বারা রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক। যেমন:
    • ১ বছরের বেশি মেয়াদের স্থাবর সম্পত্তির ইজারা বা ভাড়া।
    • জমি বা ফ্ল্যাট কেনাবেচার দলিল।
    • হেবা দলিল বা দানপত্র।

মনে রাখবেন: যেসব দলিল রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক, সেগুলো রেজিস্ট্রি না করলে আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয় না। সাধারণ ব্যবসায়িক চুক্তির ক্ষেত্রে ৩,০০/- টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে নোটারি করাই প্রচলিত প্র্যাকটিস।

উপসংহার

একটি সঠিক ও নিখুঁত চুক্তিপত্র ভবিষ্যতে বড় ধরনের আইনি জটিলতা থেকে আপনাকে বাঁচাতে পারে। মুখের কথার দাম থাকলেও, ব্যবসায়িক ও আইনি জগতে লিখিত দলিলের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই তাড়াহুড়ো না করে, অপর পক্ষের প্রতিটি শর্ত ভালো করে পড়ে এবং বুঝে তবেই চুক্তিতে সই করা উচিত। বড় অংকের লেনদেন বা জটিল চুক্তির ক্ষেত্রে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

চুক্তি শুধু কাগজের টুকরো নয়, এটি পারস্পরিক বিশ্বাস ও আইনি সুরক্ষার একটি মজবুত ঢাল।

দাবিত্যাগ: এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র সাধারণ তথ্যের জন্য। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়।
সুনির্দিষ্ট আইনি সমস্যার জন্য অবশ্যই একজন আইনজীবীর সাথে যোগাযোগ করুন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top